ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় আইনপ্রণেতাসহ নিহত বেড়ে ১                 কলেজে ভর্তির আবেদন না করলেও তাদের নামে পড়ছে আবেদন                 কানাইঘাটে ভোক্তা অধিকার আইনে ৫ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা                 পবিত্র নগরী মক্কা ও জেদ্দায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা                 ইনজেকশন দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর মুখে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী                 সবচেয়ে বেশি নারী রাইডার শ্রীমঙ্গল শহরে                 মৌলভীবাজারে মৌসুমী ফলের চাহিদা বেশী                

কিপ্টা দর্শন

: সোনার সিলেট
Published: 16 02 2019     Saturday   ||   Updated: 16 02 2019     Saturday
কিপ্টা দর্শন

গল্প

এম.আশরাফ আলী: লালকৃষ্ণের মিষ্টির দোকানে লালু ও ভুলু হাজির। গ্রামের বাজারের দোকান সাইনবোর্ড-টাইনবোর্ড নেই। তবে এ দোকানের নাম ডাক আছে। এ দোকানের মিষ্টি-মিঠাই যারা খেয়েছে তারা খুব মনে রেখেছে। অর্থাৎ ‘কৃষ্ণঘর বললেই সবাই চেনে। রসগোল্লা, খাটি ছানা মিষ্টি, জিলেপী, খাজা ইত্যাদির জন্য বিখ্যাত এই কৃষ্ণঘর। গুণেমানে সেরা মিষ্টি দোকান।
লালু ভুলু অভ্যাসমত আজও উপস্থিত। ওদের টেঁকে পয়সা থাকলে কৃষ্ণঘরের জিলেপী খেতে ভুলে না। আজ জিলেপীর পয়সা লালু দিবে। ওর কাছে দশটা টাকা আছে। আধা কেজি জিলেপী নিয়ে ওরা খেতে বসেছে। বয়সে ওরা তরুণ। লোকেদের ফায়-ফরমায়েশ খেটে জীবন চালায়। দু’জনের বাড়ি পাশাপাশি। তাদের মধ্যে খুব ভাব। একজন আরেকজনকে রেখে কোথাও যায় না। কাজে গেলে দু’জন একই সাথে যায়; খেলতে কিংবা বাজারে গেলেও তারা একই সাথে যায়। তবে দু’জনের মধ্যে একটু ফারাক আছে। লালু, ভুলু থেকে একটু চালাক আর বুদ্ধিমানও বটে। লালু ও ভুলু যখন মজা করে জিলেপী খাচ্ছে ঠিক তখনই দেখল ফকির গাজি দোকানে প্রবেশ করছে। ওরা কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছোঁ মেরে জিলেপীর থালাটি ওর দখলে নিয়ে খেতে শুরু করল।
লালু একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও সে বুদ্ধির সাথে বিষয়টি মোকাবেলা করল। মনে মনে এক ফন্দি আঁটলো সে। এটা কিছুই হয়নি এমন ভাব ধরে সে বলল-
‘গাজি দাদা জিলাপী খাইতায়। আমারে কওনা কেনে?
তুমি যতখান মনে কয় জিলাপী লইয়া খাও আমি টেকা দিমুনে। ফকির গাজি যেমন চালাক তেমনি কিপটার হাড্ডি। এ তল্লাটে কেউ ওর কাছ থেকে একটি পয়সার চা-বিস্কুট কিছুই খেতে পারেনি। তবে নিজে মেরে খেতে ওস্তাদ। সুযোগ পেলেই সবার সাথে বসে চা-বিস্কুট, ছোলা-পিঁয়াজো খেয়ে কেটে পড়বে বিল তো দেয়া দূরের কথা-সৌজন্যমূলক একটি কথাও বলবে না। ফকির গাজির দর্শন হলো-একটি পয়সা যদি যায়-সে তো নিজেরই গেল। এটা পূরণ হবার নয়। কাজেই নিজের কষ্ট হলেও পয়সা বাঁচাতে হবে। আজকে যদি কষ্ট করে পাঁচ টাকা বাঁচাই তো আগামীকাল পাঁচ টাকা + কর্ম + কষ্ট করে বাঁচানো আরো পাঁচ টাকা। কাজেই দিনে দিনে টাকা বাড়বে। ক্ষেতের কামলা হউক আর রাজ মিস্ত্রিই হউক-কৌশলে সে প্রতিদিন ৫/১০ টাকা কম দিবেই দিবে। এ বিষয়ে পঞ্চান্ন বছর বয়সী ফকির গাজি বেশ নাম করেছেন। সবাই তাকে কিপটা গাজি বলেই ডাকে। পারতপক্ষে ওর কাজে কেউ যায় না। তবে ফকির গাজি এই বিষয়ে মোটেও দৃকপাত করেন না। তার নিজের উপর রয়েছে অগাধ বিশ্বাস। কামলা না পেলে তিনি নিজেই নিজের কাজ করেন। তবে একটা জিনিস স্বীকার করে নিতে হবে ফকির গাজির মুখটা খুব মিষ্টি। যাকে ধরবেন তিনি তাকে রাজি করিয়েই ছাড়বেন। এই ধরুন-ক্ষেতের কামলাকে কাজে যাওয়ার প্রস্তাবটি তিনি এরকম করেন-
-ও শুকুর ভালা আছনিরে পুত। তোমার ইগুইন (ছেলে-মেয়ে) তো এখন আর আমার বাড়িত যাইন না যাইওরে তোমরা বরই-উরই খাইবায়নে।
শুকুর উল্যার মেয়ে ফুলমতি ছ্যাৎ করে উঠে জবাব দেয়-
-উম্, কিপটা দাদা-হেদিন কিতা কইছলায়? বরই গাছর তলেদি যাইতাম না। আমরা ওতো বেহায়া নায়। আর গেছিনি তোমার গাছর তলে?
-ওউ দেখো কিতা কয়? আরে ফুলমতি আমি তোর দাদা লাগি-না কিতা? ইতাতো কিছু ঢং ঢাং আমি করি। তুই ওতা মনো লইয়া ভইরইছত নি? যাইছ বরই খাইছগি। ও বেটা শুকুর আগামী কাইল আমার বোরো জমিনখানা রুইতাম ব্যাটা। তুই আইওইছ রে পুত। আমার ঘরো দুপুরে খাইবে। আর বিয়ালে তোরে নগদ ট্যাকা দিলাইমু। না করিছ না ব্যাটা।
-আইবায় নিরে পুত-এতটুকু বলে যখন হাত ধরে ফেলেন ফকির গাজি তখন আর শুকুর উল্লা না করতে পারে না। সে বলে-আচ্ছা চাচা, আইমুনে।
লালুর প্রস্তাব শুনে ফকির গাজি খুশি হয়ে কৃষ্ণকে বললেন-‘আধা কেজি জিলাপী দেওবা?’
কৃষ্ণবাবু আধা কেজি জিলেপী একটা প্লেটে করে ফকির গাজির সামনে রাখতেই তিনি এর প্রতি মনোযোগী হলেন। আর লালু ও ভুলুর প্লেটটি ফিরিয়ে দিলেন। লালু ভুলুকে ইশারায় বলল-‘এ্যাই জলদি খাবে।’ ভুলু ইশারা পেয়ে তড়িঘড়ি উভয়ে জিলাপী শেষ করে উঠে গেল। ফকির গাজিকে বলল ‘দাদা খাও, আমরা বারে আছি’। কৃষ্ণবাবুর কাছে গিয়ে লালু বলল-দাদার বিল দাদায় দিবা। ওউ নেও দশ টাকা। এতটুকু বলেই ওরা চম্পট দিল।
ফকির গাজি খাওয়া শেষ করতে না করতেই কৃষ্ণবাবু হাজির। চাচা দশ টাকা দেউকা।
-ই কিতা কও বা? লালুয়ে বিল দিছে নানি?
-না না তারাতো দশ টাকা দিয়া গেছেগি।
বহু চিন্তা-ফিকির করে দশ টাকা দিয়ে কৃষ্ণঘর হতে বিদায় নিলেন ফকির গাজি। কিন্তু মনে মনে খুবই ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্ত হয়ে চললেন লালুর বাড়ির দিকে। বাড়ির রাস্তায় পেয়ে গেলেন লালুকে। আর যায় কোথা?
-এ্যাই লালু, খাড়া, শুয়রের বাচ্চা। তুই করলে কিতা?
-আমারে জিলাপী খাওয়াইয়া ফাসাইয়া থইয়া আইলে?
-ফকির গাজি নিজের ছাতাটি গুটিয়ে ছাতার গোঁড়াটি শক্ত করে ধরে লালুর পিঠে বাড়ি বসাতে যাবেন-
-ঠিক ঐ মুহর্তে লালু দিল ভোঁ দৌড়।
শুরু হলো ৫৫ আর ২৫ এর মধ্যে রিলে রেইস প্রতিযোগিতা। ফকির গাজি দৌড়ে পেরে উঠলেন না। কিছুক্ষণ দৌড়ানোর পর হাঁফিয়ে উঠলেন তিনি। ছাতা উচিয়ে বললেন-আচ্ছা যারে… যাগি… তোর বাপরে পাইলে আইজ বিচার দিমু। দেখি কীতা বিচার করে?
সন্ধ্যার পরেই ফকির গাজি লালুর বাড়িতে উপস্থিত।
-কইবা লালুর বাপ? বাড়িত আছনিরেবো?
-অয় চাচা বাড়িত আছি। কিতা লাগি আইছবা?
-হুন্ ব্যাটা তোর পুয়ায় আইজ কিতা করছে? আমার দশ ট্যাকা মাটি করছে আইজ। তিনি জিলাপী খাওয়ার বিস্তারিত বিবরণ দিলেন।
শুনে লালুর বাপ মজর আলী হাসবেন না কাঁদবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। তারপরও যেহেতু উনি মুরুব্বী মানুষ বিচার নিয়ে এসেছেন-তাকে খুশি করার জন্যই চিৎকার দিয়ে বললেন-ওতা করছেনি তোমার লগে?
-এ্যাই কইগেলেরে লালু-বান্দির পুয়া তোরে আইজ আতর কান্দাত পাই, দেখবেনে কী হাল করি।
ফকির গাজি মনে মনে ভাবলেন শালা লালুর বাচ্চা লালু, দেখ কত ধানে কত চাল? আমার সাথে চালাকি! আমার দশ টাকা ক্ষতি করে পার পাবে না। তোর পিঠে দশটা বাড়ি পড়লেই আমার আত্মা শান্তি পাবে।
ফকির গাজি হিসাব করে চলতে চলতে মোটামুটি এক বড় গৃহস্তে পরিণত হলেন। গোয়ালে গরু, গোলা ভরা ধান, আর পুকুরে মাছ। সচ্ছলই বলতে হবে তাকে। কিন্তু কোনদিন তিনি নিজের জন্য ভালো কিছু ব্যবহার করতেন না। এক জামা-এক লুঙ্গি দিয়ে বছরের পর বছর চলত। কখনও সেলুনে গিয়ে নিজের চুল দাঁড়ি কাটাতেন না। তার বন্ধু আলাইয়ের চুল দাঁড়ি কেটে দিতেন তিনি। বিনিময়ে আলাই ফকির গাজির চুল দাঁড়ি কেটে দিত। কোনদিন বাজার থেকে বড় মাছ আনেননি। এশার আজানের আগে বাজারে যেতেন না। গ্রামের বাজার যখন শেষ পর্যায়ে তখন কম দামে মাছ ব্যবসায়ীরা গুঁড়া মাছ বিক্রি করত। আর ওটা কিনতেই তার নিশি মার্কেটিং। যাই হউক পঁচাত্তর বছর বয়সে তিনি একদিন শয্যাশায়ী। মৃত্যুকালই বোধ হয় উপস্থিত। অবস্থা বেগতিক দেখে পাড়া পড়শি সবাই হাজির। ইতোমধ্যে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাই উপস্থিত। ফকির গাজি ভাবলেন-সব গেছে। এত লোক কয়েক বেলা খেলেই তো গোলার ধান একটাও থাকবে না। তিনি ভালো হওয়ার মানসে উঠে বসার চেষ্টা করলেন। যেন তার কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে বসতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিধি বাম। দুর্বলতাবশতঃ পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলেন।
আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বড় মেয়ের জামাই মাস্টার কবির হায়দারও উপস্থিত। তিনি তার বড় শালাকে বললেন-‘এক কাম কর, ঘরর বড় দামা বাটাইয়া দিলাও।’ জানর বদলা জান দিলে আল্লায় হয়ত তানরে ফিরাইয়া দিবা।’ ফকির গাজি দুর্বল হলেও জ্ঞান ছিল। মেয়ের জামাই চোখের আড়াল হলে বড় ছেলেকে কাছে ডাকলেন। আর বললেন ‘বিকাল পর্যন্ত দেখো। আমার যদি জান বারই যায় তাইলে খানোখা একটা গরু মারিয়া লাভ কিতা ….।




Share Button

আর্কাইভ

May 2019
M T W T F S S
« Apr    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  

Prayer Time Table

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ভোর ৩:৫২
  • দুপুর ১১:৫৮
  • বিকাল ৪:৩৩
  • সন্ধ্যা ৬:৪০
  • রাত ৮:০৩
  • ভোর ৫:১৩


Developed By Mediait