স্বাধীনতা থাকবে কি না, দুশ্চিন্তায় ফখরুল                 বইমেলায় কামরুল আলম-এর ৫টি বই                 অনার্স ৪র্থ বর্ষের ফল প্রকাশ                 এবার টি-টেন ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট!                 পাপড়ি প্রকাশের উদ্যোগে কুবাদ বখত চৌধুরী রুবেলের ‘হৃদয়জুড়ে ছন্দমালা’ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব                 যুবলীগের সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত                 জকিগঞ্জের গ্যাস উদগীরণস্থলে প্রশাসনের লাল পতাকা                

ছোটগল্প: বনের পাখি ময়না ।। কামরুল আলম

: সোনার সিলেট ডটকম
Published: 23 09 2017     Saturday   ||   Updated: 23 09 2017     Saturday
ছোটগল্প: বনের পাখি ময়না ।। কামরুল আলম

‘ওঁয়া-ওঁয়া’ করে কেঁদে চলেছে নবজাতক। এইমাত্র ভূমিষ্ঠ হলো পৃথিবীতে। মায়ের মুখে একঝিলিক হাসিও দেখা গেল না। অন্যান্যরাও নবজাতকের জন্মে আনন্দিত হয়েছেন বলে মনে হয় না। সকলের মধ্যেেই আতঙ্ক। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর সবাই। ঘুটঘুটে অন্ধকার জঙ্গলের এককোণ দিয়ে সূর্যের একটামাত্র আলোকরশ্মি এসে ঢুকছে। সেই আলোয় নবজাতকের মুখ দেখা যাচ্ছে। আজ ৬ দিন থেকে এখানে আছে ওরা। খাওয়া-দাওয়া নেই, সবাই উপোস। জঙ্গলের লতাপাতার রস আর একটি নর্দমার পানি পান করেই জীবন ধারণ করতে হচ্ছে।
.
‘ময়নার মা, আমরা এখানে বসে থাকলে চলবে না। আমাদেরকে আরও অনেকদূর হাঁটতে হবে। বাংলাদেশে পৌঁছাতে হবে। শুনেছি সেদেশে যারা পৌঁছে গেছে তাদেরকে লোকজন খাবার দিচ্ছে।’ বললো একজন বৃদ্ধ। বৃদ্ধের নাম আব্দুল্লাহ। নবজাতকটি বৃদ্ধের নাতনি। কন্যা সন্তান জঙ্গলে জন্ম গ্রহণ করায় বৃদ্ধ ওর নাম রেখেছে ‘বনের পাখি ময়না’।
.
‘হ্যাঁ বাবা, তাই করুন। আমার ময়নাকে বাঁচানোর জন্যে আমি যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি আছি।’
হঠাৎ বিকট আওয়াজে সকলেই ভয়ে কেঁপে উঠলো। আশপাশে কোথাও বোমা ছুঁড়েছে মিয়ানমারের সৈন্যরা।
.
পরপর ৩ বার ভয়ঙ্কর শব্দে কেঁপে উঠলো বনভূমি। থেমে গেছে পাখিদের কোলাহল। বনের পাখি ময়না, বৃদ্ধ আব্দুল্লাহর নাতনি শিশুকন্যাটিও থামিয়ে দিয়েছে ‘ওঁয়া ওঁয়া’ শব্দের কান্না। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে ফাতিমা বেগম। ভয়ে কুঁকড়ে গেছে সকলে। বোমাগুলো আসলে পার্শ্ববর্তী গ্রামেই ছোঁড়া হচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধ আব্দুল্লাহ ‘বিসমিল্লাহ’ বলে সামনে পা বাড়ালেন। তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন বাকিরাও। প্রায় ৪০ জন রোহিঙ্গা মুসলিম নারী-শিশু ও বৃদ্ধ রয়েছেন এই দলে। গ্রামের বাড়িঘর সবকিছুই এতক্ষণে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ফাতিমার স্বামী ওয়াহিদ সিদ্দিকীর কি অবস্থা কে জানে। সেনাবাহিনী তাকে পেলে আস্ত রাখবে না। এতক্ষণে হয়তো টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। ভাবতেই গা শিউরে উঠছে ফাতিমার। যুবকদের কেউই এ দলে নেই। সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে আরাকানকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওয়াহিদ সিদ্দিকীও সেই দলে নাম লিখিয়েছে। ফাতিমাকে তার স্বামী বলে দিয়েছে, আমার কথা ভেবো না। আমাদের যা হয় হবে। এত মা বোনের ইজ্জত আর এত অমানবিক নির্যাতনের প্রতিরোধ না করে আমরা দেশ ছাড়বো না। প্রয়োজনে মরবো তবে তার আগে একটি সৈন্যকে হলেও হত্যা করে তবে মরতে চাই। তোমরা পাহাড় ডিঙিয়ে বাংলাদেশে চলে যাও। সেটা মুসলিম রাষ্ট্র, নিশ্চয়ই তারা তোমাদেরকে আশ্রয় দেবে। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় ওয়াহিদ সিদ্দিকীর হাতে একটা লাঠি ছিল। কয়েক শ’ যুবক জঙ্গলের দিকে আত্মগোপন করেছে। কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে রড, কারো হাতে দা, কুড়াল। এসব অস্ত্র দিয়ে মিয়ানমারের সৈন্যদের প্রতিরোধ করা সম্ভব না। তবুও এই যুবকেরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

বনের পাখি ময়নাকে নিয়ে ফাতিমারা দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলো। জঙ্গলের মধ্যে অন্ধকার, এরমধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে শুরু করেছে। কোন পথে গেলে সমুদ্র তীর কিংবা নদীর সন্ধান মিলবে, জানে না তারা। কোনদিকে গেলে বাংলাদেশের সীমান্তে সহজে পৌঁছাতে পারবে কিছুই জানা নেই। জীবনটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ সবার। কে যে কখন মারা যাবে তার কোনো ঠিক নেই। জঙ্গলে বাঘ-ভালুকেরা আছে, চাইলেই আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনেদিনও বাঘ-ভালুকের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়নি তাদের। মিয়ানমারের সৈনিক আর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তুলনায় এই বনের পশুগুলো অনেক ভালো। অনেক মানুষের একসাথে আনাগোনা দেখে বন্য পশুরাও সরে দাঁড়িয়েছে। খাবারের তীব্র সংকট ফাতিমাদের। মা হয়ে নিজের মেয়েকে বুকের দুধ পান করাতে পারছে না। নিজে না খেলে বুকে দুধ আসবে কিভাবে? সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসাতে বনের এক সমতল জায়গাতে আবার বসে পড়লো সবাই। ভোর না হওয়া পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষমান থাকতে হবে তাদের। ফাতিমাদের দলে রয়েছে অন্তত ৪০ জন মানুষ। এদের অধিকাংশই নারী-শিশু ও বৃদ্ধ। যুবক ছেলেরা কেউই নেই সাথে। যেসকল যুবক পালিয়ে যেতে পেরেছে তারাও এই জঙ্গলেরই কোনো প্রান্তে লুকিয়ে আছে নিশ্চয়। আর যাদের হত্যা করেছে সৈন্যরা তাদের কথা তো চিন্তাই করা যায় না। কী জঘন্যভাবেই না হত্যা করা হয় ওদের। জীবিত শরীর থেকে মাংসের টুকরো কেটে কেটে নিয়ে যাওয়া, চোখ উপড়ে ফেলা, শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ভয়ানক সব দৃশ্য।

এই দলে রয়েছে কিশোর সানাউল্লাহ। স্থানীয় একটি মাদরাসায় ৭ম শ্রেণিতে পড়তো। ওর বড়োভাই আমানউল্লাহকে হত্যা করেছে তার সম্মুখেই। সে তার ছোটভাই শফিউল্লাহকে নিয়ে পালাতে পেরেছে। বাড়ির দিকে ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ পায়নি। নিজের ছোটভাইকে নিয়ে পালিয়ে এলেও বাবা-মার কী অবস্থা হয়েছে তা কল্পনাই করতে পারছে না সে। সৈন্যরা যেভাবে মানুষকে মারছে তা কল্পনা করা অসম্ভব। কেউ দেখলেও হার্ট এ্যাটাকে মরে যেতে পারে! মারছে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও। ২ বছরের একটি শিশুকে চিৎ করে শুইয়ে এক পা ওর গলায় এবং এক পা তলপেটে বসিয়ে দিল এক বৌদ্ধ ভিক্ষু! কী অমানবিক ভয়াবহ সেই দৃশ্য। এমন দৃশ্য একটি দু’টি না, অসংখ্য, অগণিত। ইদানিং নাকি মানুষের মাংস রান্না করে খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছে তারা!

সানাউল্লাহর ছোটভাই শফিউল্লাহর বয়স ৩ বছর। এখনও হাঁটতে পারে না ভালো করে। এ অবস্থায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই ছেলেটির। বড়োভাই হিসেবে কাঁধে টেনে টেনে ওকে আর নিতে পারছে না। একে তো ক্ষুধা তৃষ্ণায় প্রাণ যায় যায়, এরমধ্যে কাঁধে করে ছোটভাইকে নিয়ে দীর্ঘ কয়েকদিনের পথ পাড়ি দেওয়া কেবল অসম্ভবই না, অকল্পনীয়। আরও প্রায় ২ দিন হাঁটার পর জঙ্গল পেরিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার সন্ধান পেল তারা। মরতে মরতেও বেঁচে গেল । বেঁচে গেল বনের পাখি ময়নাও। জঙ্গলে জন্ম নেওয়া এই ময়না পাখিটি কবে ফিরতে পারবে ওর নিজের দেশ আরাকানে? আদৌ কি ফিরতে পারবে কখনও? (সমাপ্ত)

লেখক: সম্পাদক- সোনার সিলেট ডটকম




Share Button

আর্কাইভ

February 2018
M T W T F S S
« Jan    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728  

Prayer Time Table

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ভোর ৫:১৯
  • দুপুর ১২:১৬
  • বিকাল ৪:১৬
  • সন্ধ্যা ৫:৫৭
  • রাত ৭:১১
  • ভোর ৬:৩১


Developed By Mediait