২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় ১৯ জনের ফাঁসি, ১৯ জনের যাবজ্জীবন                 পাপড়ি শিশুসাহিত্য পাণ্ডুলিপি পুরস্কার-২০১৮ আয়োজন                 ফরহাদ চৌধুরী শামীম : আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি || সাজন আহমদ সাজু                 ভ্রমণ পিপাসী মন শিখে ঘরে ফিরে ।। মোহাম্মদ আব্দুল হক                 পুরস্কারের জন্য পাণ্ডুলিপি আহবান করেছে পাপড়ি প্রকাশ                 ঝাল ছড়ার ডাকে সাতক্ষীরা ভ্রমণ__কামরুল আলম                 ঝাল ছড়ার ডাকে সাতক্ষীরা ভ্রমণ  ।। কামরুল আলম ।।                

ঝাল ছড়ার ডাকে সাতক্ষীরা ভ্রমণ__কামরুল আলম

: সোনার সিলেট
Published: 17 09 2018     Monday   ||   Updated: 17 09 2018     Monday
ঝাল ছড়ার ডাকে সাতক্ষীরা ভ্রমণ__কামরুল আলম

হক ভাই নিজের সিটে বসে ঘুমে ঢুলছিলেন। তাঁর পাশের সিটে (মূলত এটি আমার সিট) এক ভদ্রলোক নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। ট্রেনের এই বগিতে প্রচুর মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মাছবাজার বা গরুবাজারেও এমন ভিড় হয় না। ভিড় ঠেলে কোনোমতে সিটের পাশে গেলাম। ঘুমন্ত ভদ্রলোককে ডাকলাম, এই যে ভাই উঠুন; এটা আমার সিট। কোনো সাড়াশব্দ নেই। ঘাড়ে একটা খোঁচা দিয়ে আবারও ডাকলাম, ভাই উঠুন, এটা আমার সিট। ভদ্রলোক ঘুমের মধ্যেই আমার হাতটা সরিয়ে হকভাইয়ের ঘাড়ে হেলান দিয়ে নাক ডাকাতে লাগলেন। এবার হকভাইয়ের তন্দ্রাচ্ছন্নভাব কেটে গেল। তিনি ভদ্রলোককে ঠেলে সোজা করে বললেন, উঠুন ভাইসাহেব। সিটের লোক চলে আসছে। ভদ্রলোক এবার চোখ কচলে আমার দিকে তাকালেন। তারপর উঠে চলে গেলেন। আমি বসলাম। বসে হকভাইকে বললাম, কেমন লাগছে?
আর বলবেন না। এই যে গাদাগাদি করে ট্রেনভর্তি লোকজন, এখানে কি ভালোলাগার মতো কোনো সুযোগ আছে?
তাও ঠিক। আচ্ছা হকভাই একটা বিষয় তো ভেবে দেখা হয়নি।
কী বিষয়?
আমরা যে যশোর থেকে ফিরতি ট্রেনের টিকিট কেটেছি ৮ তারিখ সকাল ৯টা পঞ্চাশের এই ট্রেন কয়টা নাগাদ ঢাকায় পৌঁছাবে বলে আপনি মনে করেন?
সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যাবে।
আরে না, আমি একজনের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকা থেকে যে ট্রেনে আমরা খুলনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবো সেটা নাকি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল ৭টা-৮টা বাজতে পারে!
বলেন কী? এত দীর্ঘপথ!
জি, এই পথ যদি শেষ না হয় তবে …
আরে রাখেন তো কামরুল ভাই। পথ যদি এত দীর্ঘ হয় তাহলে আমাদের তো বারোটা বেজে যাবে!
না না বারোটা বাজবে কেন? ৭টা বা ৮টার মধ্যেই পৌঁছে যাবো। বড়োজোর ১০টা বাজতে পারে।
আরে কামরুল ভাই, এই বারোটা মানে ওই বারোটা না। আমরা যদি ৮ তারিখ সকালে যশোর থেকে রওয়ানা দিয়ে রাত ৯টা পঞ্চাশের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছাতে না পারি তাহলে আমাদের ঢাকা-সিলেট উপবন এক্সপ্রেস মিস হয়ে যাবে!
ও মা, তাই তো। এটা তো ভেবে দেখিনি। আচ্ছা যাই হোক, ঢাকা থেকে সিলেট তো। তখন না হয়ে বাসে চলে যাবো।
কিন্তু তারপরেও টাকাটা তো…।
হ্যাঁ, এটা একটি ব্যাপার। আচ্ছা আমরা যদি টিকিট বিক্রি করে ফেলি…।
বিক্রি করা যাবে?
করা যাবে, তবে ট্রেন ছাড়ার ঘন্টাখানে আগে থেকে স্টেশনে উপস্থিত থাকতে হবে।
আরে ধ্যাত উপস্থিত থাকতে পারলে তো আমরাই যাবো, বিক্রি করার দরকার হবে কেন?
তাও তো ঠিক, তাহলে এক কাজ করি আজকেই স্টেশনে গিয়ে টিকিট ক্যান্সেল করি। ৫০% টাকা পাওয়া যাবে।
তাহলে তাই করুন। হকভাই আনমনা ভঙ্গিতে কী যেন ভাবলেন। তারপর আবার চোখ বন্ধ করে সোজা হয়ে সিটে হেলান দিলেন।
.
দিনের বেলা ট্রেনে আমার সাধারণত ঘুমটুম আসে না। হকভাইয়ের পাশে বসতে বসতে ট্রেনের ঘটাং ঘটাং শব্দে আমারও চোখে ঘুম চলে এলো। ঘুম ভাঙলো Talha কাদিরের ফোনে। তালহার ফোনে প্রায় এক মিনিট হ্যালো হ্যালো বললাম। মানুষের চেঁচামেচি ছাড়া কিছুই শোনা গেল না। কলব্যাক করলাম। সে ফোন ধরছে না। হকভাইকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বললাম, হকভাই তালহাদের মনে হয় কিছু একটা হয়েছে। হকভাই শুনতে পেলেন বলে মনে হলো না। আমি ভিড় ঠেলে ছুটে চললাম মুয়াজ-তালহার বগির দিকে। ট্রেন তখন ঢাকার সন্নিকটে তাই লোকাল লোকজনের উপচে পড়া ভিড়। হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। গায়ের জোরে ঠেলাঠেলি করে যতটুকু যাওয়া যায় ততটুকুই। সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয় যুবতী মেয়েরাও ট্রেনের এই ভিড়ের মধ্যে চিপাচিপি করে দাঁড়িয়ে আছে। যাই হোক, অনেক ঠেলাঠেলি আর ধাক্কাধাক্কির পর তালহা-মুয়াজের সিটে গিয়ে দেখলাম তালহা নেই। Muaj সিটে বসে ফেসবুকিং-চ্যাটিং করছে গভীর মনোযোগে। ডানে-বামে তাকানোর মতো সময় নেই। আমাকে দেখে বললো, ও আপনি?
হ্যাঁ আমি। কিন্তু তালহা কোথায়?
ওই ওদিকে কোথায় যেন গেল!
মানে কী? ও তো আমাকে ফোন করেছে, কিন্তু কিছুই শোনা যায়নি।
তাই নাকি? দেখি আবার ফোন দিয়ে।
আবার ফোন দিতে হলো না। ক্লান্ত-শ্রান্ত তালহা এসে গেছে সিটের পাশে।
কী সমস্যা? ফোন করলে কেন? জানতে চাইলাম আমি।
ভাই, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। নিজের কামরায় ফিরতে পারছি না তাই ফোন করেছিলাম। আজকেই প্রথম ট্রেনজার্নি করছি তো। ভয় পেয়ে আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম!
তা এই ভিড়ের মধ্যে কোথায় যাচ্ছিলে?
এই একটু বাথরুমে গিয়েছিলাম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে কোনদিকে যাবো বুঝতে পারিনি। এরপর এমন ভিড়ের চিপায় পড়েছি আর নড়াচড়া করা যাচ্ছিল না।
ইতোমধ্যে ট্রেন ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায় প্রবেশ করেছে। আমি বললাম, আমরা তো ঢাকায় এসে গেছি। আর অল্পক্ষণের মধ্যেই কমলাপুর পৌঁছে যাবো।
.
কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছেই দেখা গেল মুয়াজের ব্যাপারে আমার কথা শতভাগ মিলে গেছে। আমরা ট্রেন থেকে নামতেই ওকে জড়িয়ে ধরলো একটি ছেলে। আমি ফেস দেখেই চিনতে পারলাম। তবুও মুয়াজ পরিচয় করিয়ে দিল নাহিদ জিবরানের সঙ্গে।Nahid Zibran কবি মোশাররফ হোসেন খানের ছেলে। উনার হয়ে জিবরান-ই পত্রিকার ইমেইল চেক করে। সেই সূত্রে বহু আগে থেকেই ওর সম্পর্কে আমি জেনেছি। কবি মোশাররফ হোসেন খানকে আমি অবশ্য ভাইয়া বলেই ডাকি। জিবরানের সঙ্গে কুশলবিনিময়ের পর জানতে চাইলাম, মোশাররফ ভাই কেমন আছেন?
বললো, জি এখন অনেকটা সুস্থ আছেন।
এখান থেকে তোমাদের বাসা কতদূর?
এই তো হেঁটে গেলে ২০ মিনিট লাগবে আর রিক্সায় গেলে আধাঘন্টা!
জিবরানের কথায় কৌতুক অনুভব করলাম। বললাম তাহলে গাড়িতে গেলে ঘন্টাখানেক লাগবে, কী বলো?
জি তা লাগবে।
Minhaz Foysol স্টেশনের এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেন খুঁজছিল। আমি জানতেই চাইলে বললো, এখানে রবির সৌজন্যে হাত-মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ওই যে, ওদিকে আসুন। রবির সৌজন্যে কবিরা হাত-মুখ ওয়াশ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। মুয়াজ আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।
কী ব্যাপার কিছু বলবে?
জি, মানে…। ও আমতা আমতা করতে লাগলো।
আমি বললাম, মানে কী? টাকা-পয়সা লাগবে?
আরে না। একটু জিবরান ভাইয়ার বাসায় যাবো।
ঠিক আছে যাও, দেরি করো না। আমরা কিন্তু জোহরের সালাত আদায় করে এখানেই কোথাও খাওয়া-দাওয়াটা সেরে নেব।
না মানে, ভাইয়া, বলছিলাম কি আমাকে একটু উত্তরা যেতে হবে।
উত্তরা, সে তো অনেক দূর। সেখানে কেন?
ওই সীমান্ত আকরাম ভাইয়ারা আছে, একটু দেখা করবো। কথা দিয়েছি।
ও মা, এতদূর গিয়ে তো তুমি ফিরতে পারবে না। ঢাকা শহরের যানজট সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণাই নেই। তাছাড়া খাওয়া-দাওয়া…।
ওখানে মুক্তাপু আমার জন্য প্রচুর রান্নাবান্না করেছেন। আর সীমান্ত ভাইয়া বললেন, কমলাপুরে ফিরতে হবে না। আমরা যে ট্রেনে খুলনা যাবো সেটা নাকি উত্তরা হয়েই যাবে। আমি ওখান থেকেই উঠবো।
ঠিক আছে যাও। কিন্তু ট্রেন মিস হলে আমার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করবে না। আমি যে কিছুটা হলেও রাগ করেছি, ও বুঝতে পারেনি হয়তো। অথবা বুঝেই না বুঝার ভান করে চলে গেল।
.
কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশেই একটি জামে মসজিদ রয়েছে। এই মসজিদে জোহরের সালাত আদায় করে একটু জিরিয়ে নিতে চাইলাম। হকভাই বললেন, মসজিদেই জিরাবেন নাকি?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
আমি বলছিলাম, আগে খাওয়াদাওয়াটা সেরে নিলে হতো না?
তাও হয়। হকভাইয়ের ক্ষিধে লেগেছে বুঝতে পারলাম। ভাবির দেওয়া টিফিনে কয়েকপিস পাউরুটি ডিম দিয়ে ভাজা সকালে ট্রেনে আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। ক্ষিধে তো লাগবেই!
.
পাশেই একটা রেস্টুরেন্ট দেখে ঢুকে পড়লাম। খাবার টেবিলেই হকভাই তাঁর নতুন সিদ্ধান্তটি জানালেন। আমরা এজন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি বললেন, আমি এখান থেকেই সিলেট ফিরে যেতে চাই।
কিন্তু কেন?
বিশেষ কারণে আমাকে ফিরতে হবে। পারিবারিক প্রয়োজন। আমার টিকিটগুলো যদি কোনোভাবে বিক্রি-টিক্রি করা যেত…।
আমরা অনেক বুঝালাম, হকভাই রাজি হলেন না। তিনি বললেন, আমি বাসযোগে একটু পরেই সিলেট ফিরতে চাই।
মিনহাজ ফয়সল একটি একক টিকিট করেছিল ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়ার জন্য। আমি প্রস্তাব দিলাম ওটা রিটার্ন দিয়ে ৫০% টাকা হকভাইকে দিয়ে দিতে। হকভাই রাজি হলেন। আমরা যেহেতু চারজনের একত্রে টিকিট করা আছে তাই কোনো অসুবিধা হলো না। বরং সুবিধাই হলো, চারজন একসাথে বসে যাওয়ার ব্যবস্থা হলো। পৃথক বগিতে একা একা বসে যাওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বেঁচে গেল মিনহাজ ফয়সল। বাকি থাকলো যশোর থেকে ঢাকা ও ঢাকা থেকে সিলেটের টিকিট। এ প্রসঙ্গে আলাপ উঠতেই তালহা বললো, ভাই আমি চলে যাই যশোর হয়ে আপনার সাথে।
আমি বললাম, কিন্তু মুয়াজ একা একা ফিরবে কিভাবে?
তাও তো কথা। কিন্তু আমার ভাই খুব ইচ্ছে যশোর যাবো। এরকম জায়গায় আর আসতে পারবো কি না কে জানে?
আচ্ছা ঠিক আছে। মুয়াজকে হয়তো একাই ফিরতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম।
মিনহাজ বললো, ও আমাদেরকে এখানে রেখে একা চলে গেছে আপুর বাসায় দাওয়াত খেতে। এবার বুঝুক ঠেলা। সবাই একযোগে হেসে উঠলাম।
.
আমি একটি ব্যক্তিগত কাজে পূবালী ব্যাংকে গেলাম। হকভাই এরই মধ্যে ইউনিক বাসের টিকিট কেটে ফেলেছেন। ব্যাংক থেকে বের হলে তিনি বললেন, কামরুল ভাই মনে কষ্ট নিবেন না। অনিবার্য কারণে আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আপনাদের যাত্রা সুন্দর হোক।
আমি বললাম, আপনাকে আল্লাহ সহিসালামতে সিলেট পৌঁছে দিন। সবাই একযোগে বললো আমিন।
.
হকভাই বিদায় নিলেন। আমরা রেলস্টেশনে অপেক্ষমান থাকলাম মাত্র ৩জন। আমি, মিনহাজ ও তালহা। সন্ধ্যা ৭টার চিত্রা এক্সপ্রেসে আমাদের টিকিট করা। মাইকে ঘোষণা হলো চিত্রা আসতে বিলম্ব হবে ঘন্টাখানেক। আমরাও বিলম্বের বিড়ম্বনায় বসে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর মুয়াজ ফোন দিল, ভাই আপনারা কোথায়?
আমি বললাম, স্টেশনে।
ট্রেন আসেনি?
না। ঘন্টাখানেক লেট হবে।
ও আচ্ছা। আমি বিমানবন্দর স্টেশনে আছি।
আরও কিছুক্ষণ পর মুয়াজের ফোন, ভাই আমাদের ট্রেনের নাম কি চিত্রা?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
আমি তাহলে ট্রেন নিয়েই আসছি।
মানে?
মানে চিত্রা এই মাত্র বিমানবন্দর এসেছে। এখান থেকেই কমলাপুর যাবে।
আমি বললাম, ঠিক আছে। তোমার ট্রেন মিস হবার সম্ভাবনা কমে গেল।
রাত ৮টার দিকে চিত্রা এক্সপ্রেস আমাদেরকে নিয়ে ছুটে চললো খুলনার উদ্দেশ্যে।




Share Button

আর্কাইভ

October 2018
M T W T F S S
« Sep    
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

Prayer Time Table

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ভোর ৪:৪৬
  • দুপুর ১১:৪৭
  • বিকাল ৩:৫১
  • সন্ধ্যা ৫:৩২
  • রাত ৬:৪৬
  • ভোর ৫:৫৮


Developed By Mediait