ছেলের কফিন আনতে গিয়ে লাশ হলেন বাবা                 হবিগঞ্জে প্রায় ২ হাজার বস্তা সরকারি চাল জব্দ                 সিলেটের ২৫টি গোডাউনে ভয়াবহ আগুন                 মৌলভীবাজারে সরকারি ও মহিলা কলেজ: একদিনে অনুপস্থিত ১৯ শিক্ষক                 বাস্তবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি ডেঙ্গু : ওবায়দুল কাদের                 তীব্র গরমে অতিষ্ঠ সিলেটের জনজীবন, বৃষ্টি হতে পারে বৃহস্পতিবার                 শুধু ধোয়া দিয়ে এডিস মশা নিধন সম্ভব নয়: কলকাতার ডেপুটি মেয়র                

পৌষের রোদে_সোলায়মান আহসান

: সোনার সিলেট
Published: 13 11 2016     Sunday   ||   Updated: 13 11 2016     Sunday
পৌষের রোদে_সোলায়মান আহসান

পৌষের সকালের শীত তাড়াতে, বারান্দায় মিঠা রোদে পিঠ দিয়ে বসে বেলী।
কয়েকদিন এতো বেলায়ও রোদের দেখা মেলেনি। সাধারণত সিলেটে একটু আগেভাগেই শীতের পদভার শোনা যায়। অগ্রাহায়ণের মাঝামাছি বেশ শীত পড়ে। এবার শীতের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের বিষয়টা চায়ের আসরে আলোচনায় স্থান পেতে থাকে। শীত পড়ে না- শীত পড়ে না- এমন একটা রব উঠে গিয়েছিল। ঠিক তেমন সময় ঝুপ্ করে শীত নামল প্রবলভাবে। ঠিক ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় বলা যায়। পৌষের শুরুতেই শীতের দাপাদাপি। কিছুটা অস্বস্তি আনে জন জীবনে। শীতকে তাড়াতে একটা প্রস্তুতি নিতে হয় না!

 

‘ঐ বেলী! ধারিত রইদ পোয়াইলে চলবোনি বেটী… নাস্তা পানি বানানি লাগবো নানি?’
ভেতর ঘর হতে মায়ের কণ্ঠ বেলীর কানে আসে। কিন্তু কোন জবাব দেয় না। নড়ে চড়ে ওঠে না। ইদানিং তার কোন কিছুই ভাল লাগে না। জানে এরপর নীরব থাকা মানে মায়ের বাজখাই কণ্ঠের নানা চুকা কথা শুনতে হবে। চুকা কথা শুনতে শুনতে এখন তেমন প্রতিক্রিয়া হয় না। গা সওয়া হয়ে গেছে। আর চুকা কথা শুনবে না কেন, বিয়ে হওয়া মেয়ে গরীব বাপের ঘাড়ে বসে দিনের পর দিন অন্ন ধ্বংস করলে চুকা কথা শুনবে না তো মিঠা কথা শুনবে সে?

 

‘ঐ বেলী’ তুইন যে সোন্দর পিঠ বার করি রইদ পোয়াইরে পাশর দোতলা থাকি তোর গা দেখের নানি, বেহায়া বেটী!’
ভেতর ঘর হতে মায়ের বাজখাই গলার প্রথম পর্যায়ের বচন শুনতে পেলো সে। তবু গায়ে মাখল না। বসে রইল। মন বলছে, বসে থাক বেলী। যতক্ষণ না কেউ খুঁচিয়ে তোলার জন্য তেড়ে আসে।
সংসার কী তার, যে সবকিছু সামলাতে হবে! সকালে উঠে নাস্তা রেডি করা। আব্বা, ছোট ভাইবোনদের ঘড়ির কাঁটা দেখে নাস্তা হাতে তুলে দেওয়া। দুপুরের খাবারের আয়োজন করা। খাওয়ানো। এতো এতো বাসন কোসন ধুয়াধায়ি করা। ময়লা কাপড়-চোপড় কাঁচা। সারাটা দিন শুধু কাজ আর কাজ। আম্মার ব্লাড প্রেসার, কোমড়ে ব্যথা তাই সংসারের কাজ করতে পারেন না, ভালো কথা, কিন্তু নেলী-শেলী তো পারে। আম্মাও কিচ্ছু বলবেন না ওদের। একচোখা নীতি। তার জীবনটাই শুধু বরবাদ হয়ে গেলো!

 

বেলীদের বাসা সিলেট শহরের শিবগঞ্জ পোষ্ট অফিসের কলোনীতে। শহরের এক প্রান্তে বলা চলে। মূল রাস্তা থেকে বেশ ভেতর দিকে কলোনী অবস্থিত। এলাকাটিতে এখনো তেমন ঘরবাড়ি ওঠেনি। ফাঁকা ফাঁকা একতলা টিনশেড বাড়িই বেশি। গাছগাছালি প্রচুর। বড় রাস্তা থেকে উত্তর দিকে যে রাস্তাটি গেছে তাও ব্রিক সয়লিং। কালো পীচে ঢাকা পড়েনি। এলাকায় কলোনীর পাঁচতলা বিশিষ্ট বেশ কতক বিল্ডিং মাথা উঁচু করে একটা আভিজাত্য ঘোষণা দিচ্ছে। প্রতিটি বিল্ডিং-এ এপাশ ওপাশ করে দশ দশটি করে পরিবার বাস করে। কলোনী থেকে অনতি দূরে একটা পুকুর। পুকুরটা মূলত মসজিদের মুসুল্লীদের ওজু করতে ব্যবহৃত হয়। কেউ কেউ অনুমতি স্বাপেক্ষে গোসল করে। কিন্তু এজমালি ব্যবহার নিষিদ্ধ। মসজিদের ইমাম সাহেব এ ব্যাপারে সদা দৃষ্টি রাখেন। কারণ কলোনীর পানি সাপ্লাইয়ের সংকটে এ পুকুরের পানিতে রান্নার কাজ চলে।

 

কলোনীর প্রথম ব্লকের ‘ডি’ টাইপ বাসার গ্রাউন্ড ফ্লোরে বেলীরা থাকে। গ্রাউন্ড ফ্লোরে বাস করায় মাটির সঙ্গে সম্বন্ধ আছে ওদের। বাসার সামনে দশ-বারো হাত জমি যা ওদের ফ্ল্যাটের লাগোয়া হওয়ায় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘেরাও করে ফুলের বাগান করেছেন আব্বা। বেলীর আব্বা গাছ প্রেমিক মানুষ। যখন যেখানে থাকেন গাছের সঙ্গে সম্পর্ক তার থাকবেই। পোষ্ট অফিসের কেরানী গোছের চাকুরি করে কিভাবে যে এই সৌখিনতা ধরে রেখেছেন আব্বা, বেলী অবাক হয়। এমনিতে রাসভারী ধরনের তিনি। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁকে এমন আষ্টেপৃষ্টে অক্টোপাসের মতো বেঁধে রেখেছে নিজেকে গুটিয়ে রাখা ছাড়া উপায় কী। হয়তো জীবন যুদ্ধে পরাস্ত নিজেকে একটু নিজস্ব ভুবনে স্বাধীন চারণ বেছে নিতেই গাছ প্রেমিক হয়েছেন। আব্বার গাছ সেবায় বেলীও সহায়তা করে থাকে। অন্তত আব্বার শখ মেটাতে সেও কিছু করতে পারছে এই অনুভূতি থাকে তার এ কাজে। প্রয়োজনীয় গাছের যতœ-আত্তি আব্বার কাছ থেকে দেখে দেখে শিখে ফেলেছে। তাছাড়া যখন ঘরের পরিবেশে মন আর বসতে চায় না- ঘরটা একটা জেলখানার কয়েদ ঘর মনে হয়, তখন এই চিলতে বাগানে এসে সতেজ হয়ে ওঠে শরীর ও মন। তাছাড়া আব্বার বাগানের পরিসর ছোট হলেও ফুল গাছের সমারোহ কম না। কয়েক ধরনের গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, সন্ধ্যামালতী, লিলি, বেলী, দুব্বা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, গন্ধরাজ, দো-পাটি, অপরাজিতা ইত্যাদি আব্বার বাগানটি করেছে সমৃদ্ধ। ফুল এক মায়াবী-প্রেম-ভালবাসা-হৃদয় নিংড়ানো অনুভূতির আধার বুঝি! ফুল ভালবাসে না এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। বেলীর ধারণা।

 

কলোনীতে বেলীদের বাসার পরিচয় ‘বাগান-বাড়ি।’ এক সময় ‘বেলীদের বাসা’ বলতো। কিন্তু বেলীর বিয়ের পর বেশ কিছুদিন তার অনুপস্থিতিতে নাকি তার নাম আর উচ্চারিত হয় না। মন্দ না, ‘বাগান বাড়ি’ হিসেবে পরিচিতিটা অর্জন করা। বেলী আব্বার সঙ্গে হাত লাগিয়ে বাগানটা সাজাতে পারলেও তার নিজের জীবনকে সাজাতে পারেনি এতোটুকু। তছনছ করে দিয়েছে মুরাদ নামক এক ‘দানব।’ হ্যাঁ, মুরাদকে সে মানুষ বলতে চায় না। বলতে পারে না। একটা অপাপ কিশোরী উত্তীর্ণ নারীর জীবনকে দংশনে দংশনে বিষাক্ত করে তুলেছে।
‘ঐ বেলী! খালি রইদ পোয়াইলে দিন যাইবনি বে? নাস্তা-পানি-কতো বেইল….’ বলতে বলতে আম্মা নাজমা বেগম বারান্দায় এসে মেয়ের মুখপানে তাকিয়ে চুপ মেরে যান।
বেলীর চোখে অশ্র“র চি‎হ্ন বুঝি! একেবারে মুখ বন্ধ করে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নাজমা বেগম।
মানুষের অনুভূতি যখন তীব্র রূপ ধারণ করে তখন দু’টো প্রকাশ ঘটে। এক. মুখে ভাষা থাকে না। দুই. চোখে কান্না আসে না। নাজমা বেগমের অবস্থাও যেনো তাই।

 

‘আম্মা, তুমি খালি আমারে ত্যক্ত করতায় পারো- নেলী শেলী তারারে কইতায় পারো না? নাস্তা কি তা আমি এখলা খাইনি?’
বেলী যেভাবে বসা ছিল সেভাবে থেকে বলল! মুখ তার মেঝের দিকে ছিল। চোখে পড়ে একটা পিঁপড়ার সারি। মেঝের সরু একটা ফাটল থেকে বের হয়ে দলবেঁধে এগোচ্ছে। মরা তেলাপোকা কোত্থকে পেয়ে তা টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য হিসেবে। তেলাপোকাটা পিঁপড়ার তুলনায় বহুগুণ বড় হওয়া সত্ত্বের সম্মিলিত পিঁপড়ার প্রচেষ্টায় খাদ্য হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে পিঁপাড়ার বসতবাটিতে। বেলী ভাবে, এভাবে সবাই মিলে কাজ করলে অনেক বড় এবং কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। যেমন সংসারের বেশি চাপ পড়ে না। এ কথাটাই আম্মাকে সে বোঝাতে পারেনি আজতক।
‘কি তা তোর শরীর খারাপ নি?’

 

নাজমা বেগমের কণ্ঠে সহানুভূতির সুর। কাছে এসে বেলীর পাশে আরেকটা মোড়া টেনে বসে। সকালের রোদে তেতে ওঠেছে বেলীর পিঠ। নাজমা বেগম হাত রেখে আঁচ পান। এ হাত স্নেহের। এ হাত এক বুক বেদনার। এ হাত অপরাগতার। বেলী অনুভব করে।
বেলী মুখ উঠিয়ে আম্মার মুখের দিকে তাকায়। বয়স যতোটা না তারচেয়ে অনেক বেশি কাতর করে ফেলেছে সংসারের চাপ, শারীরিক অসুস্থতা। তবু চেহারাতে একটা নিষ্পাপ সৌন্দর্য দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
চোখাচোখি হয়ে বেলী লজ্জায় মুখ লুকালো। এ লজ্জা মায়ের অবাধ্য হওয়ার জন্য। কিন্তু কয়েক সেকেণ্ড। পরক্ষণে বাঁধভাঙ্গা নদীর মতো আছড়ে পড়ে ঢেউ মনে। চোখ ফেটে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা অশ্র“। বেলী তার মায়ের শুকনো মুখে চোখের লোনা পানির গড়িয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখে স্থির থাকতে পারে না। বিন্দু বিন্দু জমানো চোখের পানি শীতল অনুভূতি দিয়ে বোবা কান্নায় যে বরফের চাঁই গড়ে তুলেছিল নিজের মাঝে, তা যেনো মুহূর্তে গলে একাকার।

 

‘আম্মা-আম্মাগো আমি আর পারিয়ার না-’
জড়িয়ে ধরে বেলী মাকে। মুখ লুকায় মায়ের বুকে। স্তনের ঠিক মাঝখানে। নিরাপদ ও সান্তনার স্থল এই মায়ের বুক। সব সন্তানই মায়ের বুকে সান্তনা পায়- শান্তি লাভ করে। নির্ভরতা লাভ করে। অন্তত মানসিকভাবে। কিন্তু নাজমা বেগম কী পেরেছে তার বুকে সন্তানের শান্তির আশ্রয় হতে। পেরেছে এই বুকটি তার বেলীর পরম আশ্রয় হতে সান্তনা ও নিরাপত্তা দিতে!
এসব অনুভূতি মনে জাগতেই নাজমা বেগম আর স্থির থাকতে পারলো না- ‘বেলীরে- মাই আমার, আমি পারছি না- পারছি না-’
বেলীর কান্নায় আরো বেগ পায়। কান্নার উপলক্ষ্য যখন পরিবেশ পায় তখন এর গতি বাড়ে- সময় সীমাও দীর্ঘ হয়। এভাবে কতক্ষণ দু’জনের কান্না স্থায়ী হয় তা নিজেরা জানে না। তবে বেলী অনুভব করে বুকের ভেতর একটা পাথর যা চেপে বসেছিল, একটু আলগা হয়েছে- হালকা বোধ করছে।
‘কিতাবা নাস্তা-পানি আইজ’
বারান্দায় এসে মা মেয়ের আবেগঘন দৃশ্য দেখে সাব পোস্ট মাস্টার হাসান চৌধুরী মুখের কথা অসম্পূর্ণ রেখে চুপ মেরে যান। দাঁড়িয়ে থাকে স্থানুর মত। বাক্হীন হয়ে কয়েক মিনিট।

 

এই কান্নার জন্য সে-ই দায়ী। বিয়ের সময় কথা মত মেয়ের শ্বশুর বাড়ির চাহিদা সে পূরণ করতে পারেনি বলে ছ’মাসের মাথায় মেয়েকে ফেরৎ আসতে হয়। সে প্রায় দেড় বছর আগের ঘটনা। আজও পারেনি মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি পাঠাতে। পারেনি সেই দাবী পূরণের সামর্থ্য অর্জন করতে। সংসারটা তার বড়ই। তিন মেয়ে দুই ছেলে। ছেলে দু’টি ছোট মেয়ে তিনটি কলেজ পড়–য়া। যদিও বেলী বিয়ের পর আর কলেজমুখো হয়নি লজ্জায়। কলোনীর ভেতর চলে নানা কানা-ঘুষা। বেলীকে নিয়ে। রাস্তার বখাটে ছেলেরা তো আছেই। সুযোগ পেলেই নানাভাবে উত্যক্ত করে। দু’টি মেয়ের কলেজ পড়ার খরচ কম তো নয়। দু’টি ছেলের একটি প্রাইমারি স্কুলে যায়। তার অবশ্য খরচ অল্পই। সবার ছোটটি এখনো বাসায় স্লেট-পেন্সিল দিয়ে অ আ ক খ আঁকিবুকি করে। কিন্তু মেয়ে নেলী ও শেলীর পেছনে প্রতিদিন খরচ দিতে হয়। আজকাল পড়াশোনা মানেই নানা ধরনের খরচ। যাওয়া-আসার রিক্সা ভাড়া, বই-পত্তর, নোট-গাইড, কলেজের এটা ওটা অনুষ্ঠানের চাঁদা- লেগেই আছে। হিমসিম খেতে হয় এসব কুলোতে। আগে বাড়ি থেকে কিছু পেতো। মাই (মা) যখন জীবিত ছিলেন। অন্তত বছরের চালটা আসতো। গাছ-টাছ বিক্রি, মাছ বিক্রি নানান উপলক্ষে মাই বড় ছেলের ভাগের টাকাটা অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে বাদ বিসস্বাদ করে গুছিয়ে রাখতেন। বাড়িতে গেলে গোপনে মাই হাসান চৌধুরীর হাতে তুলে দিতেন। বছর দুই হলো বাড়ি থেকে আর কিছু পায় না। বড় ভাই হিসেবে ছোটদের জোর করে বলতেও পারে না। আকার ইঙ্গিতে নিজের সমস্যা তুলে ধরতেই ছোট ভাইয়েরা তাদের নানা সংকটের কথা শুনিয়ে দেয়। আর যেহেতু বাড়িতে সে থাকতে পারে না- জমি-জিরাত সহায়-সম্পত্তি দেখাশুনা করতে পারে না সে, জোর করে কিছু চাওয়ার মানসিক শক্তিটুকু পায় না।
‘আব্বা, তুমি খাড়াইয়া থাকছ কিতা- তোমার শরীর খারাপ নি?’

 

মোড়ায় বসা থেকে ওঠে বেলী বাবার কাছে আসে। নাজমা বেগমও আঁচল দিয়ে চোখ মুছে অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকায়।
বেলী বাবার মুখের দিকে স্থির থাকতে পারে না। যে অশ্র“র ধারা সে একটু আগে প্রায় সংবরণ করে ফেলেছিল- বাবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না- ‘আব্বাগো…. ’
হাসান চৌধুরী মেয়ের পিঠে হাত রেখে স্নেহের পরশ বুলাতে থাকেন।
‘বেলী মারে ! আমি এক অপদার্থ বাপ, একটা লাখ টাকা যোগাড় করতে পাররাম না করি আমার এমুন সুন্দর মায়ের জীবনে ওতো কষ্ট- আমি অপরাধী মা, আমি অপরাধী’
হাসান চৌধুরীর গলা ধরে আসে। নাজমা বেগম ইতিপূর্বে নিজেকে খানিকটা ধাতস্থ করে নিয়েছিল তা স্বামীর আবেগঘন কথায় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
উঁহু…. হু… হু… হু… ।

 

একটা চাপা কান্নার সুর নাজমা বেগমের কণ্ঠ থেকে বের হয়ে এলো। পরিবেশটা করে তুললো আরো ভারাক্রান্ত। বেলীর মনে হতে থাকে এমন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সেই দায়ী। রোজকার মত সকালে উঠেই যদি রান্না ঘরে ঢুকে পড়তো। রুটি বানিয়ে টেবিলে হাজির করতো। মুখ বন্ধ করে সবার যা যা দরকার তার যোগান দিতে পারতো তবে এমনটা ঘটতো না।
‘না আব্বা, না, আমার কুন কষ্ট নাই মনে, তুমি এইসব নিয়া একদম চিন্তা করবা না- তুমি লাখ টাকা যোগাড় করি দিলেও ঐ মুরাদ দানবটার কাছে আমি ফিরিয়া যাইতাম নায়- মানুষ থাকে মানুষের লগে- মুরাদ মানুষ নায়- তুমি ওর লগে আমার সম্পর্ক জীবনের লাগি মিটানির ব্যবস্থা কর আব্বা’
বাবাকে বেলী জড়িয়ে ধরে। বাঁধভাঙ্গা জোয়ারকে কে ঠেকাতে পারে। বেলীর বুকে আবেগের প্রবল ঢেউ। মুরাদের কাছ থেকে সে যে অবহেলা অত্যাচার আর অকথা শুনেছে তার দৃশ্য দু’চারটা স্মৃতিপটে হাজির হওয়ায় দুঃখে খান খান হয়ে যায় বুক- বেলীর।
‘আব্বা, মুরাদটা একটা পশু-আব্বা’

 

এমন আবেগঘন পরিবেশে নীরবতাই অনিবার্য। মানুষের আবেগ ধারণ করার অদ্ভুত উপায় হচ্ছে নীরবতার গহীন জঙ্গলে আত্মগোপন করা। কিন্তু সেই আত্মগোপন করে কতক্ষণ থাকা যায়। সরব পৃথিবীর বুকে নিজের অস্তিত্ব গোপন করা যায় না। কোন না কোনভাবে প্রকাশ হবেই।
‘আমি হেতু কইছিলাম যেতা তোমার সামর্থ্যে কুলার না, ইতার ব্যাপারে করাল করিও না বেলীর আব্বা- হুনলায় না’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাজমা বেগম নীরবতা ভঙ্গ করলো।
নাজমা বেগমের কণ্ঠ হাসান চৌধুরীকে জাগিয়ে তুলল। এতো দুঃখের মধ্যেও নাজমা তাকেই দোষারোপ করে সে মুক্তি পেতে চায়? এতক্ষণ যে কান্নাকে বুকে চেপে আসছিল। পরিস্থিতি সহনশীল করার চেষ্টায়। এবার তার বিস্ফোরণ ঘটল বুঝি- ‘বেলী মা রে……’
হাসান চৌধুরীর সশব্দে কান্নার আওয়াজ ভোরের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে ভেতর ঘর পর্যন্ত পৌঁছে। নেলী শেলী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে বারান্দায়। ঘুম জড়িত চোখে এমন আবেগঘন দৃশ্য দেখে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আধা মিনিট পর দু’জনই জড়িয়ে ধরে বাবাকে। তিন মেয়ের আবেষ্টনীতে হাসান চৌধুরীর মনের দুঃখ দ্রুত প্রশমিত হতে থাকে। কিসের এতো চিন্তা-এদেরকে নিয়ে তার, জীবন সাজানোর সময় তো ফুরিয়ে যায়নি!

 

‘আব্বা! মানুষের ভাগ্য কেউ নিতো পারে না। তুমি ছোড সময় গল্প করছিলা-রাজকন্যা দাসী অইতে, দাসী রাজকন্যা অইতে- আমার ভাগ্যে যেতা আছিল’
‘কিন্তু মা-রে! তোর মতো এমুন সোন্দর লক্ষিমন্ত মেয়ের ভাগ্য এমুন বুরা অইল কিতার দায়’
আব্বাকে বসিয়ে দেয় একটা মোড়ায় বেলী। মিনিট পাঁচেক নীরবতা চলে। স্বাভাবিক হয়ে আসতে থাকে পরিবেশ।
‘আব্বা, আমি চাই নিজোর পায়ে দাঁড়াইতে তুমি আমারে একটু সাহায্য করবানি?’
বেলী বাবার কাছে ঘনিষ্ঠভাবে বসে বলল।
‘কি তা সাহায্যারে মা ?’
হাসান চৌধুরী মুখ তুলে তাকায় মেয়ের দিকে। বেলীর চোখে মুখে একটা সংকল্প দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করে।
‘আমি আবার কলেজে যাইমু- পড়াশোনা করতাম- যেভাবে পড়লে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়- আমি আর মানষের দয়ার পাত্র থাকতে চাই না- যতোদিন আমি পড়াশোনা শেষ না করি ততোদিন তোমার সাহায্য চাই’
নাজমা বেগম এগিয়ে আসে মেয়ের দিকে। চোখে মুখে যে দীপ্তি দেখতে পায় বেলীর- ইতিপূর্বে এমনটি দেখেনি। তাই তার মনেও সাহস জেগে ওঠে।

 

‘আমিও চাই মা, তুইন পড়াশোনা করতে। আমারার যত্তো কষ্ট অউক আমি তোর পড়ার খরচ চালাইমু’
একটু থেমে- ‘আমি চিন্তা করিয়ার তোর দাদীর মৃত্যুর পর বাড়ির সাহায্য বন্ধ- সংসারটা টানিয়া টানিয়া চলের, একটা পার্ট টাইম কাজ শুরু করমু- একটা ইলেকট্রনিক্স দোকানের মালিকের লগে কথা অইছে- সন্ধ্যার পর ঐখানে বইমো আমার রেডিও-টিভি-ফ্রিজের মেরামতের কাম জানা- বালা পয়সা দিবা কইছুন তারা’
‘আব্বা, তুমি সারাদিন অফিস করিয়া আবার রেডিও-টিভির মেরামতের কাম করবা! তোমার শরীরে কুলাইবনি? কাম নাই তোমার বাড়তি রুজির। আমার পড়ার খরচ আমিই নিজেই যোগাড় করতে পারমু। কলোনীতে দু’চারটা বাইচ্চারে পড়াইমু- মাত অইছে লাকী আপার লগে-’ বেলী বাবার পিঠে হাত রেখে বলে।

 

‘আব্বা আমিও একটা টিউশানী যোগাড় করিয়া নিমুনে- তুমি অফিসের বাদে জব নিয়ো না- শরীরে কুলাইতো নায়- অনতি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেঝোটা নেলী বলল। নেলী দেখতে বেলীর চেয়েও সুন্দর। পরীর মত। সবাই বলে। কোকড়ানো চুল। চোখ দুটো মায়াবী। ভ্রƒ জোড়া যেনো আঁকা। অবশ্য হাসান চৌধুরীর তিনটি মেয়েই হয়েছে মায়ের মত।
নাজমা যৌবনকালে তাদের পরিবারের মধ্যে সৌন্দর্যে সেরা বউ ছিলো। শুধু কি সৌন্দর্যে? আচার-ব্যবহারেও। হাসান চৌধুরী ভাবে।
‘ঘন্টা দুয়েক সময় দোকানে বইমু- কিচ্ছু অইতো নায়! পয়সা পাইলে খাটনী সহ্য অয়। বড় লোকেরাও কম খাটনী করইন না। কষ্ট না করলে পয়সা রুজি করা যায় না। তোমরা কষ্ট করবা পড়াশোনায়- বালা রিজাল্ট করবা- অইটা অইল তোমরার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি-’
নেলী আর কথা বাড়ায় না। আব্বার সঙ্গে তর্ক করা তারা জানে না। কোনদিন করেও নি। আব্বা খুব নরম দিলের মানুষ। বুকের ভেতর শুধু ভালবাসা। সবার জন্য। চাচারা এতো নিষ্ঠুর আচরণ করেন তবু আব্বা তাদের বিরুদ্ধে একটু কটু কথা বলেন না। আগে দাদী থাকতে বাড়ি থেকে এটা সেটা আসতো। টাকা-পয়সাও দাদী দিতেন। তাদের ভালই চলেছে। কলোনীতে ওরা বেশ বনেদী বনেদী ভাবে চরাফেরা করতে পেরেছে। এখন বিগত দু’বছর বাড়ি থেকে চাচারা কিচ্ছু দিচ্ছেন না।
বেলীও আর কথা বাড়ায় না। ধীরে ধীরে রান্না ঘরের উদ্দেশে হাঁটা দেয়। অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে। আজ ছুটির দিন বলে আব্বার অফিস নেই। নেলী, শেলী, জাকারিয়ার কলেজ-স্কুল নেই। তাই এই দেরীটা কোন সমস্যা করবে না।
নেলীও ভাবে, রান্না ঘরে আপুর সঙ্গে নাস্তা বানানোতে সাহায্য করা দরকার। প্রতিদিন আপুটা একা একা কতো কষ্ট করে। নেলীও ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

 

বেলা উঠার সাথে সাথে সূর্যের আলো বারান্দায় এসে পড়তে থাকে আরো
বিস্তৃতভাবে। এতোক্ষণ বাগানের ফুল গাছের ফাঁক ফোকর গলিয়ে চিরল চিরল সূর্যালো প্রবেশ করছিল। এখন অবাধ বিচরণে ক্রমে ভোরের কুয়াশা কেটে যেতে থাকে। স্পষ্ট হয়ে ওঠতে থাকে বেলীদের গৃহ প্রাঙ্গণ। পৌষের শীতে এ সূর্যের আলো এক দারুণ মজার পরশ। হাসান চৌধুরী ও নাজমা বেগম পাশাপাশি বসে সূর্যের আলোর দিকে পিঠ দিয়ে সেই উত্তাপ ভাগ করে।
‘বেলীর আব্বা, আপনার বাইয়েরা জমির ধান যখন দিতো চায় না, এক কাম করুখা, আপনি আপনার অংশ বেচিয়া দেউখা- বেচিয়া টাকা কোন ব্যবসায় লাগাইন’
‘না, বেলীর আম্মা, এইটা করলে বাইয়েরা মনো কষ্ট পাইবা- তারা একদিন বুঝবা- আল্লায় তারার বুঝ দিউক এই দোয়া খান করিও নামজোর পাটিত।’

 

এই হচ্ছে হাসান চৌধুরী। সর্বংসহা। অফিসে সবচেয়ে গুরু দায়িত্ব চেয়ে নেয়। সবচেয়ে জটিল বিভাগ সে বেছে নেয়। এইভাবে হাসান চৌধুরী একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তাতে কী তার জীবনে তেমন কোন উন্নতি ঘটেছে ? সামনে শুধু দায়িত্ব-কর্তব্যের এক দঙ্গল বেড়া। প্রতিদিন ডিঙ্গাতে ডিঙ্গাতে ক্ষীণ হচ্ছে তার দেহ। কতো দিন পারবে এই বোঝা টানতে ? আজকাল শরীরে ঘূণ ধরেছে। কোমড়ে পিঠে ব্যথা। চোখের পাওয়ার বেড়েছে। আর কতো দূর ?
হাসান চৌধুরী সূর্যের দিকে মুখ করে এসব ভাবতে থাকে। কিন্তু হৃদয়ে সূর্যের তেজ ধারণ করতে পারে না। এমনি মমতা ভালবাসার দেহ তার।




Share Button

আর্কাইভ

August 2019
M T W T F S S
« Jul    
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Prayer Time Table

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ভোর ৪:১১
  • দুপুর ১২:০০
  • বিকাল ৪:৩২
  • সন্ধ্যা ৬:২৯
  • রাত ৭:৪৭
  • ভোর ৫:২৭


Developed By Mediait