ছড়াকার জিসান মেহবুব’র সঙ্গে পাপড়ি পরিবারের ছড়াড্ডা                 রংমহল টাওয়ারে অভিনব কায়দায় চুরি                 ছড়াকার কামরুল আলম’র ৩৭তম জন্মদিনে বিশেষ ছড়াসন্ধ্যা অনুষ্ঠিত                 ছড়াকার কামরুল আলম-এর ৩৭তম জন্মদিন ২৫ নভেম্বর                 শিশুসাহিত্যিক-ছড়াকার গোলাম নবী পান্নার সঙ্গে পাপড়ি পরিবারের আড্ডা                 ‘নাদিমস ফটোগ্রাফি’ এ্যাওয়ার্ড পেলেন মিস ফিলিপাইন                 জাপানে ৩০তম টকিও আন্তর্জাতিক ফিল্ম উৎসব অনুষ্ঠিত                

সিলেট: পর্যটনশিল্পের এক অপার সম্ভাবনাময় এলাকা ___আখলাক আহমদ

: সোনার সিলেট ডটকম
Published: 01 11 2016     Tuesday   ||   Updated: 01 11 2016     Tuesday
সিলেট: পর্যটনশিল্পের এক অপার সম্ভাবনাময় এলাকা ___আখলাক আহমদ

নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি সিলেট। সিলেটের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য, আছে বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি এবং উৎসব ও আনন্দ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনকেন্দ্র। সিলেটকে পর্যটনের রাজধানী বললেও ভুল হবে না মোটেও। দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজ রংয়ের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) সহ ৩৬০ আউলিয়ার পূণ্যভূমিখ্যাত সিলেটে রয়েছে সুবৃহৎ ও সুউচ্চ জলপ্রপাত মাধবকুন্ড, আছে হাকালুকির হাওর, হামহাম জলপ্রপাত, জাফলংয়ের পাথর কোয়ারিসহ ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টি কাড়ার মতো অনেক জায়গা।

সিলেট বিভাগের উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য, পূর্বে ভারতের আসাম রাজ্য এবং পশ্চিমে অবস্থিত ঢাকা বিভাগ। বাংলাদেশের প্রাচীণ এই বিভাগটিতে রয়েছে ৪টি জেলা যার প্রায় সবক’টিই পর্যটনে সমৃদ্ধ। সিলেট জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর দরগাহ বা মাজার এবং হযরত শাহপরান (রহ.) এর দরগাহ বা মাজার। সুদূর ইয়েমেন থেকে ধর্ম প্রচারের জন্য এদেশে এসেছিলেন সাধক পুরুষ হযরত শাহজালাল (রহ.)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন হযরত শাহপরান (রহ.) সহ ৩৬০ আউলিয়া। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটককে সিলেটে আসতে দেখা যায় কেবল তাঁদের মাজার জিয়ারতের জন্য। হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারের পাশে তাঁর ব্যবহৃত কতগুলো মূল্যবান জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। যেমন- একজোড়া কাঠের খড়ম, হরিণের চামড়ার তৈরি জায়নামাজ, তাঁর সঙ্গে আনা উট পাখির ডিম, তাঁর তায়াম্মুম করা পাথরখন্ড, জালালি কবুতর, ঐতিহাসিক একটি তলোয়ার যেটি তিনি ব্যবহার করতেন। হযরত শাহপরান (রহ.) ছিলেন শাহজালাল (রহ.) এর বোনের পুত্র অর্থাৎ ভাগনা। মামার মতো ভাগনার গুরুত্বও অত্যধিক। তাই তাঁর মাজারেও লোকসমাগম ঘটে নিয়মিত। সিলেটের অন্যতম আরেকটি পর্যটনকেন্দ্র হচ্ছে তামাবিল। তামাবিল সিলেট শহরের প্রায় ৫৫ কিলোমিটার উত্তওে সিলেট-শিলং (ভারত) যাতায়াত পথের প্রান্তসীমায় চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের মধ্যে অবস্থিত। মনোমুগ্ধকর পাহাড়ি দৃশ্য ছাড়াও তামাবিলের প্রান্তসীমা থেকে জলপ্রপাত দেখা যায় ক্ষীণভাবে। প্রতিদিন ভারত থেকে অসংখ্য ট্রাক স্থলপথে এই বন্দরে কয়লা নিয়ে আসে যেখান থেকে বাংলাদেশ বছরে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে থাকে।

এছাড়া এখানকার স্থলপথে অনেক বিদেশি পর্যটকও বাংলাদেশে প্রববেশ করেন। পাথরের রাজধানী হিসেবে পরিচিত জাফলংয়ের কথা উল্লেখ না করলে সিলেটের পর্যটনশিল্প’র বর্ণনা অসমাপ্তই থেকে যাবে। যারা সৌন্দর্যপিপাসু তাদের পক্ষে জাফলংয়ের আকর্ষণ এড়ানো সম্ভব নয় কিচুতেই। সিলেটের র্পটনশিল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এই জাফলং। জাফলং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে প্রতিবছর অগণিত পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। গোয়াইনঘাট উপজেলার খাসিয়া- জৈন্ত্যিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং সত্যিকারের একটি নৈসর্গের লীলানিকেতন। সবুজ প্রকৃতির পাশাপাশি জাফলংয়ের বিপুল পরিমাণের পাথরের রাজ্যে ভ্রমণ করে মুগ্ধ হন দর্শনার্থী তথা পর্যটকবৃন্দ। সারি নদী ও পিয়াইন নদীকে কেন্দ্র করেই মূলতঃ গড়ে ওঠেছে জাফলংয়ের এই নান্দনিক পাথর সা¤্রাজ্য। চারদিকে শুধু পাথর আর পাথর। নদী থেকে পাথর তোলার দৃশ্যটাও দেখার মতোই বটে। গহীন অরণ্যাঞ্চলও জাফলং সৌন্দর্য্যরে অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। এ বনাঞ্চলে খাসিয়া উপাজাতিদের জীবনধারা দেখে মুগ্ধ হন পর্যটকরা।

সিলেট নগরীর প্রবেশদ্বারে সুরমা নদীর ওপর ১৯৩৬ সালে নির্মিত ক্বিনব্রিজটিও সিলেটের অন্যতম পর্যটনশিল্প হিসেবে গণ্য হয়। এ ব্রিজটি তৎকালীন ইংরেজ গভর্ণও ‘মাইকেল ক্বিন’ তাঁর নিজের নামে নির্মাণ করেছিলেন। ১১৫০ ফুট লম্বা ও ১৮ ফুট প্রশস্ত ক্বিন ব্রিজটি লোহা দিয়ে তৈরি। ক্বিনব্রিজের পাশেই রয়েছে পর্যটকদের দেখার মতো একটি ঘড়ি যা ‘আলী আমজদের ঘড়ি’ হিসেবে পরিচিত। বিখ্যাত জমিদার আলী আমজদ দৃষ্টিনন্দন এ ঘড়িঘরটি নির্মাণ করেন। সিলেটের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান হলো ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ। নগরীর দক্ষিণ পূর্বপ্রান্তে একটি ছোট টিলার ওপর শাহী ঈদগাহ অবস্থিত। দেশের প্রাচীণ শাহী ঈদগাহের মধ্যে এটি অন্যতম। দৃষ্টিনন্দন, মনোমুগ্ধকর ও কারুকার্যময় এই শাহী ঈদগাহের রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। জানা যায়, ১৭৮২ ঈসায়িতে এখানে সৈয়দ মুহাম্মদ হাদী ও সৈয়দ মুহাম্মদ মেহেদী ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে ইংরেজবিরোধী অভ্যূত্থান সংঘটিত হয়েছিল। এ ঘটনায় ইংরেজদের মুখোমুখি সংঘর্ষে সৈয়দ মুহাম্মদ হাদী ও সৈয়দ মুহাম্মদ মেহেদী ভ্রাতৃদ্বয় শহিদ হন। এছাড়া বিভিন্ন সময় এই শাহী ঈদগাহ ময়দানে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রেখে গেছেন কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মাহাত্মা গান্ধী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, শহীদ সোহরাওয়াওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ, কে ফজলুল হকসহ উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনীতিকরা। পর্যটন নগরীখ্যাত সিলেটে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরও তীর্থভূমি। শহরের মধ্যেই বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী গুরুত্বপূর্ণ মন্দির রয়েছে। এরমধ্যে মন্দির বাড়ি, লামাবাজার রোডের দশনামী আখড়া, মহাপ্রভূ জিউর আখড়া, বন্দরবাজারের ব্রম্মমন্দির উল্লেখযোগ্য। পর্যটকদের জন্য সিলেট জেলার জৈন্তাপুরে রয়েছে জৈন্তিয়া রাজবাড়ি। একটি সমৃদ্ধ, ঐতিহ্যবাহী জনপদ জৈন্তারাজ্য একসময় ছিল প্রাচীণ নারীরাজ্য। ঐতিহাসিক এবং দর্শনীয় অনেক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন এখনও টিকে আছে জৈন্তা রাজবাড়িতে। সময়ের পরিক্রমায় রাজবাড়ি এবং ফটক ধ্বংসের প্রায় দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হলেও এখনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রিয় পর্যটকরা ঐতিহাসিক এ স্থানে দুর্দন্ড সময় কাটাতে পছন্দ করেন। এখানে বর্তমানে দেখার মতো অবশিষ্ট আছে শিবপূজার জন্য নির্মিত মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, রাজ্যের সভ্যগণ যে বিরাট পাথরে বসতেন সেসব পাথর খন্ড যার নাম মেগালিথ। এছাড়া অক্ষত অবস্থায় আছে বধ্যভূমিও। এখানে অবাধ্যদেরকে হত্যা করা হতো। জৈন্তা রাজবাড়ি তাই সিলেটের পর্যটনশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সিলেট জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের উত্তরদিকে অবস্থিত ভোলাগঞ্জের পাথর কোয়ারি। কোয়ারি ‘বাংলার সোনার খনি’ হিসেবে চিহ্নিত। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে বন্যার তোড়ে নদী ও ছড়া দিয়ে প্রচুর পাথর এ কোয়ারিতে এসে জমা হয়। শুধু পাথর নয়, পাহাড়-পর্বতের মনোরম সৌন্দর্য্যও ভোলাগঞ্জের এ সা¤্রাজ্যকে পর্যটকদের জন্য একটি চমৎকার দৃশ্যপটে পরিণত করেছে। এখানে দেখা যায় থরে থরে সাজানো পাহাড়। আকাশছোঁয়া এসব পাহাড়ের ওপাশে বারতের চেরাপুঞ্জি ও শিলংয়ের অবস্থান।

দৃষ্টিনন্দন ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিও তাই পর্যটন শিল্পে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সিলেট জেলার কানাইঘাটের মুলাগুল পাথর কোয়ারি সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সিলেটের বৃহত্তর পাথর কোয়ারিগুলোর মধ্যে মুলাগুল অন্যতম। এ পর্যটনকেন্দ্রে এখনো সেভাবে পর্যটকদের পদচারণা শুরু হয়নি। কারণ এখানে জাফলং ও ভোলাগঞ্জের মতো সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি। লোভাছড়া নদীর উপর দিয়ে নৌকায় মুলাগুল ভ্রমণে গেলে অসামান্য এক অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হবে। নদীর দু’পাড়ের দৃশ্য এতই মনোমুগ্ধকর যে পর্যটকরা বিমোহিত না হয়ে পারেন না। এছাড়াও সিলেটে আছে আরো বেশ ক’টি চিত্তবিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্র। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ড্রিমল্যান্ড এ্যামিউজমেন্টট পার্ক, এডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড, নাজিমগড় রিসোর্ট ,জাকারিয়া সিটি এবং ওসমানি শিশুপার্ক।

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারও পর্যটনশিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে ‘মাধবকু- জলপ্রপাত’ যা দেশের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক প্রাণবন্ত ঝরণা। দেশের বৃহত্তম এ জলপ্রপাতের উচ্চতা ১৬২ ফুট। অপরূপ এ ঝর্ণা দেখার পাশাপাশি ঘনসবুজ নিঝুম পাহাড় পাথারিয়া দেখেও মুগ্ধ হয়ে থাকেন। এ স্থানে মাধমকু- ছাড়াও এখানে ‘পরকু-’ নামে আরেকটি ছোট ঝর্ণা রয়েছে। মাধমকু-ের অপরূপ সৌন্দর্য্যরে টানে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক ছুটে আসেন মৌলভীবাজারে। মৌলভীবাজারকে বলা হয় বাংলাদেশের চা-রাজধানী। কারণ দেশের একমাত্র চা-গবেষণা ইন্সটিটিউটটি মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত। এখানে রয়েছে চমৎকার বিভিন্ন ফুলের সমারোহে তৈরি দৃষ্টিনন্দন ফুল বাগান, টি টেস্টিং ল্যাব, ভেষজ উদ্ভিদেও বাগান, বিটিআরআই উদ্ভাবিত বিভিন্ন চায়ের প্রজাতি। এছাড়াও রয়েছে ৫০/৬০ বছরের পুরনো চা গাছ প্রভৃতি। সবকিছু মিলিয়ে এ চা-গবেষণা ইন্সটিটিউটটিও সিলেটের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র বটে। মৌলভীবাজারারের পর্যটন হিসেবে বর্তমানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে মনু নদী প্রকল্পের মনু ব্যারেজ এলাকা। মৌলভীবাজার শহর থেকে পূর্বদিকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মনু ব্যারেজে প্রতিদিন অনেক পর্যটক ভিড় করেন। মনু ব্যারেজ এলাকার প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই চমৎকার। পূর্বে পাথারিয়া পাহাড় এবং পশ্চিমে ভাটেরা পাহাড়। মধ্যবর্তী স্থানে বিশাল নি¤œাঞ্চলজুড়ে এ হাওরের ভৌগলিক অবস্থান। বর্ষা মৌসুমে এ হাওরকে মনে হয় যেন একটি মহাসাগর। চারদিকে অথৈ জলরাশির কারণেই এমন টা মনে হয়। এর বিপরীত দৃশ্য চোখে পড়ে শুষ্ক মৌসুমে। এ সময় পুরো হাওরজুড়ে থাকে বিস্তৃত ফসলের মাঠ। ‘হাকালুকি’ হাওর নামে এ হাওরটি সিলেট অঞ্চলের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বহুল পরিচিত।

অপরদিকে শ্রীমঙ্গল শহরের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে বিশাল এলাকাজুড়ে ‘হাইল হাওর’। এককালে বৃহত্তর সিলেটের মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত এ হাওর শীত মৌসুমে হাজার হাজার অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। তিনদিকে পাহাড়বেষ্টিত হাইল হাওরকে অনেকে সমুদ্রের ছোট কন্যা বলেও ডাকেন। শ্রীমঙ্গলের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হচ্ছে সীতেশ বাবুর মিনি চিড়িয়াখানা। শহরের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ‘রূপসপুরে’ অবস্থিত এ চিড়িয়াখানায় প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। এই চিড়িয়াখানায় বিরল প্রজাতির অনেক প্রাণী রয়েছে যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের পাশে ভাড়াউড়া চা বাগান সংলগ্ন ২৫ দশমিক ৮৩ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত চা রিসোর্ট টি শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্পের বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর এই ‘টি রিসোর্ট’ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে আগত পর্যটকদের আবাসনের জন্য রয়েছে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা সম্বলিত অত্যাধুনিক রেস্ট হাউস। এছাড়াও আছে দৃষ্টিনন্দন সুইমিংপুল। হযরতম শাহ মোস্তফা (রহ.) এর মাজারও মৌলভীবাজারের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র। শহরের শাহ মোস্তফা সড়কে হযরত শাহজালাল (রহ.) এর অন্যতম সফরসঙ্গি হযরত শাহ মোস্তফা (রহ.) এর মাজারের পুকুরে রয়েছে শতবর্ষী গজার গাছ। এছাড়া মাজারের পাশের বেড়িলেকের পাড়ে রয়েছে হযরত নূর আলী শাহ’র মাজার। এখানে আগত পর্যটকগণ মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নিজেদেরকে তৃপ্ত করে থাকেন। এছাড়াও কোনো কোনো পর্যটক বেড়িলেকে নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে পরিতৃপ্ত করেন নিজেদেরকে।

শ্রীমঙ্গলের ভ্রমণে আসা পর্যটকদের জন্য রয়েছে নীলকণ্ঠের ‘সাত রঙের চা’ পানের সুবর্ণ সুযোগ। চা গবেষণা ইন্সটিটিউট চত্বরের কাছেই অবস্থিত নীলকণ্ঠের চা এর দোকানটি অবস্থিত। চা শ্রমিক রমেশের আবিস্কৃত সাত রঙের চা ইতোমধ্যেই দেশ-বিদেশে অগণিত পর্যটককে মৃগ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে । শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে রয়েছে হাজার হাজার প্রজাতির বৃক্ষ। প্রকৃতিকে যারা ভালোবাসেন তারা অবশ্যই লাউয়াছড়ার ঘন সবুজ অরণ্যে বারবার চলে আসেন। কেবল বৃক্ষ নয়, লাউয়াছড়া নানান প্রজাতির পশুপাখির আশ্রয়স্থলও। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলানিকেতনের আরেক স্থান মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা। প্রকৃতির নিপুন হাতে গড়া, বিভিন্ন জাতি, উপজাতি ও সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ বৈচিত্রময় পর্যটন পলন্টী এই কমলগঞ্জ। এখানাকার প্রাকৃতিক পরিবেশের পরতে পরতে রয়েছে সবুজের সমারোহ। ভ্রমণপিপাসুরা এখানে বেড়াতে এসে সবুজের সমারোহে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেন প্রায়ই। রাস্তার দু’ধারে ছোট বড়ো পাহাড়-টিলা তার বুকে রোপিতা দু’টি পাতা, একটি কুঁড়ির চা গাছ সমৃদ্ধ নয়নাভিরাম চা বাগান। চা বাগানের কাছেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বড়ো একটি হ্রদ। হ্রদটি দর্শনার্থীদের অপার আনন্দ দেয়। এছাড়া এখানে রয়েছে ‘হামহাম জলপ্রপাত’ এবং বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গ্যাসকূপ- মাগুরছড়া। বাংলাদেশের চায়ের রাজধানীখ্যাত পর্যটন জেলা মৌলভীবাজরে রয়েছে ১৫২টি ছোট-বড়ো চা বাগান যা পর্যটকদের প্রতিনিয়ত আকৃষ্টই কেবল করে না, হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে।

সিলেট বিভাগের আরেক জেলা সুনামগঞ্জেরও সুনাম রয়েছে পর্যটন জেলা হিসেবে। হাওর জেলা হিসেবেই সুনামগঞ্জকে চিহ্নিত করা হয়। টাঙ্গুয়ার হাওর এখানকার সর্ববৃহৎ হাওর। প্রচুর পর্যটকের আগমনের প্রেক্ষিতে এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার নিমিত্তে ইউনেস্কো অতিসম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর প্রেক্ষিতে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই হাওরে মাছ ধরা এবং হাওওে পরিভ্রমণ করা এখন নিষিদ্ধ। এই হাওরে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হয়। দেশ-বিদেশের পর্যটকগণ এখানে ভ্রমণ করতে আসেন। সুনামগঞ্জ জেলার গৌরারং জমিদার বাড়ির বস ৫ শতাধিক বছর। বাড়িটির অপূর্ব নির্মাণশৈলী দেখতে পর্যটকরা ছুটে আসেন বারবার। এছাড়া সুনামগঞ্জে হাসন রাজার বাড়ি ও সমাধিসৌধ দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন ছুটে আসেন। সুনামগঞ্জের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে যাদুকাটা নদী ও রাজবাড়ি, সুখাইর জমিদার বাড়ি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত নারায়ন তলা, ছাতকের জর্জ ইংলিশ টিলা, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, জগন্নাথপুরের বাসুদেব মন্দির, রাধারমণ দত্তের সমাধি, দোয়ারাবাজারের দোহালিয়া জমিদার বাড়ি, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড প্রভৃতি।

হবিগঞ্জও পর্যটকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এখানে রয়েছে সাড়ে ৬০০ বছরের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ যা একটি নান্দনিক শিল্প নিদর্শন বটে। বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এটি নির্মাণ করেন। নয়নাভিরাম এ মসজিদটি হবিগঞ্জ জেলা সদরের রাজিউড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত উচাইল এর শংকরপাশায় অবস্থিত। কালের পরিক্রমায় যদিও শংকরপাশা শাহী মসজিদ জৌলুস কিছুটা হারিয়ে ফেলেছে, তবু দৃষ্টিনন্দন এ ঐতিহাসিক মসজিটি পর্যটকরদের মুগ্ধ করে এখনও। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া চা বাগান ও বড়ো বাংলৈা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ স্থান দুটি পর্যটন কেন্দ হিসেবে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বাংলোতে বসে মুক্তিযুদ্ধের মূল পরিকল্পনা হয়েছিল এবং পরে এখানে বসেই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সেনা সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নে। তাই চা বাগানের মাঝখানে গাছগাছালির ছায়াঘেরা তেলিয়াপাড়া বড়ো বাংলোটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক হয়ে আছে। বড়ো বাংলোটির পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে চমৎকার একটি স্মৃতিসৌধ। এ পর্যটনকেন্দ্রটিতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক পরিভ্রমণে আসেন। এছাড়া হবিগঞ্জ জেলার অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.) এর মাজার, বানিয়াচংয়ের রাজবাড়ি ও সাগরদীঘি প্রভৃতি। এক কথায় বলতে গেলে পর্যটনের ক্ষেত্রে সিলেট অপার সম্ভাবনাময় একটি এলাকা। সিলেট বিভাগের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে এগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে আগামী দিনে সিলেট বিভাগই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন ও উৎকর্ষময়ী পর্যটনকেন্দ্র যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও রাখতে পারবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।




Share Button

আর্কাইভ

December 2017
M T W T F S S
« Nov    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Prayer Time Table

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ভোর ৫:১০
  • দুপুর ১১:৫৫
  • বিকাল ৩:৩৬
  • সন্ধ্যা ৫:১৫
  • রাত ৬:৩৪
  • ভোর ৬:৩০


Developed By Mediait