Header Border

সিলেট, সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২০ ইং | ১০ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) ৩০°সে

কোভিড পজিটিভ ও সামাজিক বিড়ম্বনার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা

আনজার আল মুনির।। করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর পর  পরিবারটি বুঝতে পারে, স্বজনের মৃত্যুই হয়ত সবচেয়ে বড় আঘাত নয়।
দাফন করার জন্য লাশ যখন  তাদের গ্রামে নিয়ে যান, জানাজা ও মাটি দেয়ার জন্য গ্রামের কেউ আসেনি।
এমনকি কবর খুঁড়তেও আসেনি কেউ। সবাই ভাবছে এখানে এলে তাদেরও করোনা হবে।
পরিবারে আর কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় তখন সেবা প্রতিষ্ঠান  আল মারকাজুলকে ফোন করা হয়। ঘণ্টা দুয়েক পরে তাদের একটি দল এসে জানাজা পড়ে দাফন করে। দাফনের পর গ্রামবাসীর অসহযোগিতার আরেক ধরণ দেখতে পান তারা।
অমানবিক আচরণ করে গ্রামের লোকজন। মৃতের  স্ত্রী ও সন্তানদের বাইরে থেকে ঘরে তালা দিয়ে আটকে রাখতে চেয়েছিল তারা। কোনো আত্মীয়স্বজনকে বাড়ির ত্রিসীমায় আসতে দেয়নি। সাধারণত মৃত মানুষের বাড়িতে খাবার দেয় আত্মীয়স্বজন, কিন্তু কেউ খাবার দেয়নি এমনকি কাউকে খাবার নিয়ে আসতেও দেয়নি।
ভুক্তভোগীর ভাষায়  “শোকের পরেও মানুষের খেতে হয়। আবার রোজাও শুরু হইছে। তখন বাধ্য হয়ে আমরা নিজেরা প্রতিবেশী কয়েকজনকে বলি কিছু বাজার করে দিতে, তখন তাদেরও হুমকি দেয়া হয় যে কেউ বাজার করে দিলে তাদেরও ঘরে তালা মেরে দিবে। 
আমাদের কারো করোনাভাইরাসের কোনো উপসর্গ নাই, পরীক্ষা করে তাদের সবার নেগেটিভ আসছে। কিন্তু গ্রামের কেউ সেটা বিশ্বাস করছে না। তাদের সাথে কেউ কথা বলে না। কাছেও আসে না কেউ। সবাই ভাবে তাদেরও এই রোগ হতে পারে।”
আরেক ভুক্তভোগী বলেছেন তাদের বাবা আক্রান্ত হবার পর এবং তার মৃত্যুর পরে আরো একবার তিনি ও তার মায়ের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছে, দুইজনেরই নেগেটিভ এসেছে ফলাফল।
করোনাভাইরাসের কারণে অনেক পরিবারকে অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে।
“কিন্তু আশেপাশের মানুষের আচরণ দেখলে মনে হয়, আমি ও আমার মা কোনো দোষ করেছি। তারা সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু আমাদের যেন দোষীর চোখে দেখে সবাই। যেন আমার বাবা মারা গেছেন এটা আমাদের কোন অপরাধ।”
“১৪ দিন টানা বাড়িতে থাকার পর যখন আমি বাসা থেকে বের হলাম, দেখলাম চারপাশের মানুষ হঠাৎ সরে যাচ্ছে দুই পাশ থেকে। এখনো বের হলেই দেখি নির্ধারিত সামাজিক দূরত্বের চেয়ে অনেক বেশি দূরে দূরে সরে যায় মানুষ।”
“আমার বাবা মারা গেছে, আমাকে বা আমার মাকে কেউ সান্ত্বনা তো দেয়ই না, উল্টো কেউ কথাও বলে না আমাদের সাথে। জানি না মানুষ কি আগে থেকে এরকম অমানবিকই ছিল, নাকি এখন করোনার কারণে হয়েছে।”
বিগত ৭ জুন বিবিসির প্রতিবেদনে তুলে ধরা জামালপুর ও নারায়ানগনঞ্জের এই দুটি বিভৎস ঘটনা যখন  পড়ছিলাম তখন জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ডাক্তার মেহেদী স্যার কল করে জানালেন আমার কোভিড -১৯ রিপোর্ট পজিটিভ  এসেছে। মানসিকভাবে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকায় ভেঙে পড়িনি কিন্তু উপরের প্রতিবেদন দেখে নিজেকে অবচেতন মনে সেখানে কল্পনা করে গা শিউরে উঠেছিল।  তবে আমি মনে করেছিলাম আমার ক্ষেত্রে এসব হবে না। সব এলাকায় এরকম হয় না৷ কিন্তু তখনও আমার কল্পনায়ও ছিলো না যে এরকম অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষ সবখানে ছড়িয়ে রয়েছে।
রিপোর্ট পজিটিভ শোনার পর সমাজ থেকে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো, এসব পরীক্ষা করানোর ই বা কি প্রয়োজন?  এতোদিন কম পরীক্ষা  হওয়ায় সবাই সমালোচনায় মুখর ছিলো কিন্তু নিজের এলাকায় সনাক্ত হওয়ার পর সবাই পরীক্ষার সমালোচনায় ব্যস্ত। কি ভয়ানক সুযোগ সন্ধানী দ্বিমুখী নীতি। কিছু লোক আছে ভীষণ এলাকাপ্রেমী তারা বলে আমাদের এলাকায় তো এটা আগে ছিলো না। আমি ই প্রথম নিয়ে আসছি। মনে হচ্ছে কি ভয়ংকর কোনো অপরাধ করে ফেলেছি অসুস্থ হয়ে। অথচ এসব এলাকাপ্রেমী ভাই ও চাচারা ঘরে ঘরে মাদকের মরণ থাবার সমালোচনা করে না। ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত দুটি বন্ধুর পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর অপবাদ দেওয়া হয়েছিলো সরকারি সুবিধা পেতে রিপোর্ট পজিটিভ করানো হয়েছে। আমার ক্ষেত্রেও তা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে যে বিশেষ সুবিধা নিতে তদবির করে রিপোর্ট পজিটিভ করিয়েছি৷ দেশের পুরো সিস্টেমের ওপর কি জঘন্য অপবাদ। লিখতেও রুচিতে বাঁধছে। আমি পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রের বাসিন্দা হয়েও যদি এসব কুসংস্কার শুনতে হয় তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আক্রান্তদের কি শুনতে হচ্ছে আর কি লাঞ্চনা বঞ্চনা সহ্য করতে হচ্ছে আর ভাবলে মন বিষন্নতায় ছেয়ে যায়৷
মানব জীবনে বিপদ-আপদের যতগুলো ক্ষেত্র আছে, তার মাঝে অসুস্থতা অন্যতম। মানুষ যে কত বড় অসহায়, তার বাস্তব উপলব্ধি ঘটে অসুস্থ অবস্থায়। এমন পরিস্থিতিতে কোনো শত্রুও যদি দেখা করতে আসে বা তার সাহায্যে এগিয়ে আসে, তবে সে তাকে আর শত্রু মনে করে না। সে তখন তার নিকট পরম বন্ধুতে পরিণত হয় এবং তার অন্তরে ওই শত্রুর জন্য আলাদা একটা জায়গা সৃষ্টি হয়। তাই রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া বা সাধ্যমতো তার দেখ-ভাল করা ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির একটা বড় উপায়।
রুগ্ন ব্যক্তির দেখা-শোনার বিষয়টি ইসলামি শরিয়ত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।
রুগ্ন ব্যক্তির সেবার মাধ্যমে প্রভুর নৈকট্য লাভ করা সহজ। রোগী পরিচর্যার ফজিলত সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি কোনো রোগীর পরিচর্যা করে, সে রহমতের মধ্যে ডুব দেয়, এমনকি সে যখন সেখানে বসে পড়ে, তখন তো রীতিমতো রহমতের মাঝে অবস্থান করে’। -আল আদাবুল মুফরাদ।
একজন মুসলমানের প্রতি অপর মুসলমানের দায়িত্ব-কর্তব্য (হক) সম্পর্কে যে কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর প্রত্যেকটিতে ‘রোগীর পরিচর্যা’র বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত আছে।
যদিও ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে দেখতে যাওয়া যাবে না তবুও এটা ছাড়া অন্যভাবেও সৌজন্যতা রক্ষা করা যায় যা অনেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছেন।  কিন্তু আক্রান্তদের ওপর সমাজের নেতিবাচক আচরণের প্রভাব এতটাই বেশি যে তা অনেক সময় সকল সহমর্মিতাকে ছাপিয়ে  হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।
জ্ঞান- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই সোনালী সময়ে এসেও আমরা যদি আরো মানবিক ও ইতিবাচক  হতে না পারি, নিজেদের মানসিকতাকে আরো বিস্তৃত কর‍তে না পারি তবে শিক্ষার এতো বিস্তারের  সামাজিক প্রভাব প্রশ্নবিদ্ধ।
আক্রান্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তির পরিবারের প্রতি এমন কোনো আচরণ না করি যাতে উপরোক্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত এলাকাদ্বয়ের উদাহরণে নিজেদের এলাকা শামিল করে।  আশেপাশের যারা এখনো আদিম মন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি তাদেরকে সংশোধন করে সবাই মিলে একটি মানবিক সমাজ গঠন করে এই বৈশ্বিক মহাদূর্যোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তা উপলব্ধি করার যোগ্যতা দান করুন। আমীন।
লেখক : করোনা আক্রান্ত স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, মুরারিচাঁদ কলেজ,  সিলেট। 
এসএসডিসি/ কেএ

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

কামরান স্থানীয় রাজনীতি করেও একজন জাতীয় নেতা
বেসরকারি হাসপাতাল! কতটুকু সেবা,কতটুকু ব্যবসা?
ক্ষতিটা শুধুই নিরীহ জনতার, কারো নেই দায়!
লাশ ফেলে দেয়ার বয়ান ও চিকিৎসকের কান্না
সিলেট নগরের জেব্রাক্রসিং প্রসঙ্গে।। কাওসার চৌধুরী
নতুন জামায়াত কতদূর যেতে পারবে?_শেখ রোকন

আরও খবর

Shares