Header Border

সিলেট, রবিবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং | ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) ২৩°সে

ঈদ হোক সকলের জন্য আনন্দের

কামরুল আলম: মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। টানা একটি মাস সংযম সাধনার পর এক অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে আগমন ঘটে ঈদের। বিশ্বজুড়ে মুসলমানেরা আনন্দঘন পরিবেশে ঈদের উৎসব পালন করে। ঈদ বলতে আমরা নতুন জামা কাপড় পরে হইহুল্লোড় আর ঘুরে বেড়ানোকেই বুঝি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঈদের আনন্দ এটা নয়। ঈদের মূল আনন্দ হলো সাদাক্বাতুল ফিতরের মধ্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা সাদাক্বাতুল ফিতরের চর্চা না করে ঈদের আনন্দকে গান বাজনা ও কেনাকাটার মাধ্যমেই উদযাপন করি। গরিবের মুখে হাসি ফুটানোর নামই ঈদ। কিন্তু প্রতিবছর ঈদ আসে, ঈদ যায়; গরিবেরা গরিবই থাকে। তাদের মুখে হাসি ফুটে না।

ঈদের দিন সকালে ঈদগাহে ধনী-গরিব বির্বিশেষে সবাই এক কাতারে ঈদের সালাত আদায় করলেও সালাত শেষে কোলাকুলির বেলায় দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ধনী ও বিত্তবানরা নিজেদের মধ্যে কোলাকুলি করে প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে বাড়ি ফেরার দিকে যখন মনোযোগী হন তখনও হাজার হাজার দরিদ্র লোকজন গাড়ির জানালায় মাথা টুকতে টুকতে কাকুতি মিনতি করে একটু সাহায্যের আশায়। অবশ্য ভিক্ষুক শ্রেণির বাইরে আরো বড়ো একটি দরিদ্র শ্রেণি আছে যারা সাহায্যের জন্য কারো কাছে হাত পাতে না। প্রয়োজনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি দিয়ে কিংবা গামছা কাঁধে ঝুলিয়ে ঈদের সালাত শেষ করলেও তারা কারো সাহায্যের আশায় বসে না থেকে নিজেদের কাজে নিয়োজিত হয়। বিত্তবান লোকজন ভুলে যান এইসব দরিদ্র শ্রেণির লোকজনেরও ইচ্ছে করে নতুন জামাকাপড় পরার। এরাও বছরে একদিন অন্তত ফিরনি শেমাই খেতে চায়। বিশেষ করে এসব দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কথা ভাবলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। ফুলের মতো পবিত্র এইসব শিশুরা যখন তাদের বাবা মা’র কাছে নতুন জামাকাপড় ও ভালো ভালো খাবারের দাবি করে তখন কষ্টে বুকটা ফেটে গেলেও কিছুই করতে পারে না তাদের পিতা-মাতা। হয়তো বা কেবল কষ্টের প্রতিধ্বনিই বেরিয়ে আসে তাদের বুক চিরে। অথচ ‘ঈদুল ফিতর’ নামটাই রাখা হয়েছে এইসব লোকজনের জন্য। ফিতরা ধনীদের নিকট গরিবের হক। এটা কোন ভিক্ষা বা দান বিশেষ নয়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর এ ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। হয়তো সকলেই বা অধিকাংশ লোকই ফিতরা আদায় করছেন, কিন্তু সঠিক পদ্ধতিতে তা আদায় না করার ফলে এসব ফিতরা কোনই কাজে আসছে না; স্থাপিত হচ্ছে না সামাজিক সাম্য।

আমাদের দেশে কেবল মুসলিম সমাজেই ঈদ আসে না, বরং এটা হয়ে যায় সার্বজনীন আনন্দ উদযাপনের উপলক্ষ; যার দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল। ঈদের পূর্বে অনেক হিন্দু ভাই বোনদেরও কেনাকাটা করতে দেখা যায়। তারাও ঈদের দিনে সজ্জিত হন নতুন পোশাকে। সবার ঘরেই থাকে বিশেষ খাবার-দাবারের আয়োজন। পাড়া-মহল্লায় হিন্দু মুসলিম মিলেই তৈরি করা হয় আনন্দের নানা আয়োজন। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো দিক। কিন্তু এরপরও ঈদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব হয় না ধনী-গরিব বৈষম্যের কারণে। এ বৈষম্যের কারণে এসব উৎসব আনন্দ কোনটাই কাজে লাগে না সামাজিক উন্নয়নে। যখন নানা আয়োজনে ঈদের আনন্দে ধনী বা বিত্তবানেরা মেতে ওঠেন তখনও তাদের প্রতিবেশী বিত্তহীনদের অনেকের ঘরে চাল ডাল কেনার টাকাটা পর্যন্ত থাকে না। অথচ ঈদুল ফিতরের মূল থিমটাই হচ্ছে ফিতরা দিয়ে গরিবের হক আদায় করা। ফিতরা ঈদের সালাতের আগেই দেওয়ার নিয়ম। কারণ ফিতরার উদ্দেশ্য, দারিদ্রের কারণে যাতে কেউ আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, তার নিশ্চয়তা বিধান করা। কিন্তু সামর্থ্যবানরা সঠিক নিয়মে ফিতরা বা যাকাত না দেওয়ার ফলে দরিদ্র বা বিত্তহীনরা ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় প্রতিবছর। ফলে আনন্দের ঈদটাই অনেকের কাছে হয়ে যায় বড়ো ধরনের কষ্টের কারণ। রামাদ্বান মাস সংযমের হলেও অধিকাংশ বিত্তবান রোজাদারই খাওয়া-দাওয়ার পেছনে অঢেল অর্থ ব্যয় করেন এ মাসে। রোজা শুরুর পূর্বেই ‘রোজার বাজার’ করার রেওয়াজ প্রচলিত রয়েছে আমাদের সমাজে, যা কেবল হাস্যকরই নয় বরং রোজার শিক্ষার বিপরীত একটি আচরণ। প্রতিদিন তিনবেলা ভালোমন্দ খাবার খেলেও রোজার মাসে ইসলামি বিধান হলো দিনের বেলা উপোস থেকে কেবল রাতের বেলা সাহরি ও ইফতার এ দুইবেলা খাবারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু আমরা সারাদিন উপোস থাকলেও রাতের বেলা এত বেশি ও দামি দামি খাবার গ্রহণ করি যা হিসাব করলে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হয়ে যায়। সবাই ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে ব্যস্ত থাকলেও প্রতিবেশীর প্রতি কোন দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না। দরিদ্র স্বজন বা প্রতিবেশীর প্রতি কোন দায়িত্ব পালন না করে রোজা ও ঈদে যতো আনন্দই করা হোক না কেন মনে রাখতে হবে এটা ইসলামের বিধানের পরিপন্থী। আজকাল ঈদের সময়ে অতি আধুনিক একশ্রেণির তরুণ-তরুণীকে পাড়া-মহল্লা ও রাস্তায় কিংবা নিদেনপক্ষে নিজেদের বাসার অভ্যন্তরে কান ফাটানো শব্দযন্ত্রের বিদেশি গানের আয়োজন করতে দেখা যায়। বিষয়টি যে কেবল ইসলামের বিধানের পরিপন্থী তা নয়, বরং এতে অন্য অনেক মানুষের অসুবিধাও হয়।

ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সাধারণত নগদ টাকা ভাগ করে দিতে দেখা যায়। তাই ঈদ আসার আগেই ফিতরা দেওয়ার জন্য টাকা ভাঙানোর কাজে অনেককেই ব্যস্ত দেখা যায়। এক দুই টাকার নোটও কেউ কেউ ফিতরা হিসেবে প্রদান করেন যা সাধারণত ভিক্ষুকদের দেওয়া হয়। উনারা মনে করেন ঈদের সময় ভিক্ষুকের সংখ্যা বেশি তাই ফিতরা প্রদান করতে হয়, বিষয়টি আসলে সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। প্রত্যেক মুসলমানের জানা দরকার, প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর যুগে মুদ্রা হিসেবে দিনার এবং দিরহামের প্রচলন থাকা সত্ত্বেও তিনি (সা.) মুদ্রার পরিবর্তে খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। অথচ সে যুগেও ফকির-মিসকিনদের মুদ্রা বা টাকা পয়সার প্রয়োজন হতো। খাদ্যদ্রব্য বলতে অনেকেই মনে করেন খেজুর কিসমিস বা যব দিয়েই মনে হয় ফিতরা আদায় করতে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ জাতীয় কিছু খাদ্যদ্রব্য আমাদের দেশের গরিব মানুষের কোনই কাজে আসবে না। তাই চাল বা আটা ময়দা জাতীয় খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা জরুরি। এক কথায় যেটা মানুষের স্বাভাবিক খাবার সেটাই ফিতরা হিসেবে দেওয়া উত্তম। তাছাড়া টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও একজন গরিব মানুষকে বা একটি পরিবারকে যে টাকা দিয়ে ঈদের আনন্দে শরিক করা যায় সে পরিমাণ টাকাই দেওয়া দরকার। দুই চার পাঁচ টাকা দিয়ে কারো সঙ্গে আর যাই হোক আনন্দ শেয়ার করা সম্ভব নয়।

আমাদের দেশে ঈদ উদযাপনের অন্যতম আরেকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট হচ্ছে- আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন ঈদের সময় নিজ নিজ পরিবারের সান্নিধ্যে যাওয়ার চেষ্টা করি। ট্রেন, বাস, লঞ্চ, নৌকাসহ নানা বাহনে চড়ে ঈদের ছুটিতে শহর থেকে নাড়ির টানে গ্রামের দিকে ছুটে চলতে দেখা যায় সবাইকে। এসময় বড়ো বড়ো দুর্ঘটনারও সংবাদ পাওয়া যায়। পরিশেষে এটাই প্রত্যাশা, সবার ঈদ উদযাপন নিরাপদ ও নির্বিঘœ হোক। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার ঘরে পৌঁছে যাক ঈদের আনন্দের সওগাত। হিংসা-বিদ্বেষ আর ভেদাভেদ ভুলে এক মহা মিলনোৎসবে পরিণত হোক এবারের ঈদুল ফিতর।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

এক বছর বয়সেই পাক্কা রাঁধুনী!
কাউকেই কষ্ট দিতে রাজি নন, একসঙ্গে ২ বান্ধবীকে বিয়ে করলেন যুবক
জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যে হাঁটল শিশু!
বাঙালির বংশ-পদবীর উৎপত্তি
মোটরসাইকেলে গরু বহনের ভিডিও ভাইরাল
ছুরি নিয়ে ভয় দেখানো কাঁকড়ার ভিডিও ভাইরাল

আরও খবর

Shares