Header Border

সিলেট, বৃহস্পতিবার, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ ইং | ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) ২৩°সে

ধারাবাহিক গল্প: স্বপ্ন ভাসে চোখে (তৃতীয় পর্ব)__কামরুল আলম

‘সত্যমিথ্যার চিরন্তন লড়াই’ শিরোনামে কলামটি লেখা শেষ করেই সেলফোনের স্ক্রীণের দিকে তাকালো কাওকাব ওরফে সাদাত সালেহী সাগর। রাত তিনটা বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি। মুখে হাই তুলতে তুলতে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো সে। বাথরুমের হাইকমোডে বসে বসে স্মার্টফোনটিতে নেট কানেকশন লাগালো মনের অজান্তেই। ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকা যায় না, গত তিনদিন যাবৎ তবুও নেটের বাইরে থাকতে হয়েছে।
সেদিন রাত্রে শারমিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর থেকে জীবনটা অন্যরকম হয়ে গেছে তার। শারমিন তার খুব পরিচিত, খুবই কাছের কেউ? গভীর রাতে শারমিনের ফোন কলে সেদিন ঘুম ভাঙলেও এখন সারাটি রাতই সে নির্ঘুম কাটিয়ে দিচ্ছে। রাতের সময়টাকে লেখালেখির কাজে লাগাচ্ছে। আগে লিখতো ফজরের সালাত আদায়ের পর। রাত বারোটা সাড়ে বারোটায় ঘুমাতে গেলে ফজরের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুম ভেঙে যেত তার। কিন্তু গত তিনটি রাত শত ইচ্ছা করেও সে ঘুমাতে পারছে না। যদিও ফোনে শারমিনকে ‘পার্কে গিয়ে নষ্টামি করতে পারবো না’ বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল। মনকে মানাতে পারছে না সাগর। ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে শারমিন নামে কেউ ছিল না। সেদিন ফোনে কথা বলার পর সার্চ করেছে, পায়নি। কিন্তু হঠাৎ ভাইবারের ম্যাসেজ অপশনে একটি ম্যাসেজ তাকে অবাক করে দিয়েছে। ‘মিস্টার সাগর, নিজেকে যতোই আড়ালে রাখার চেষ্টা করো না কেন, আমি তোমাকে ঠিক খুঁজে পাবো। – নদী’ ছোট্ট এ ম্যাসেজটিই তাকে ইন্টারনেটের বাইরে নিয়ে গেছে।

বাথরুমের হাইকমোডে বসে বসে ভাইবারের ম্যাসেজ অপশনে চলে গেল সাগর। নদী আর কিছু লিখেছে কি না সেটাই দেখতে চায় সে। এই মেয়েটি তাকে জ্বালিয়ে শেষ করে দেবে। গত বছর অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে দাঁড়িয়েছিল শারমিন। ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়েছিল তার দিকে। সে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে যথারীতি। কিন্তু পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল শারমিন।

-সাগর সাহেব, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
-কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার কোন কথা নেই, থাকতে পারে না।
-সাগর সাহেব শুনেন, প্লিজ একটু দাঁড়ান। শারমিন সাগরের বাম হাতটা ধরে টান দিয়েছিল লোকজনের সম্মুখেই। ডান হাত দিয়ে ঠাস করে একটা থাপ্পড় মেরে হ্যাঁচকা টানে বাম হাতটি ছাড়িয়ে নিয়ে হন্ হন্ করে চলে গিয়েছিল সাগর। এখনও ঘটনাটি চোখে ভাসে তার। মেয়েটির প্রতি বড়ো বেশি অবিচার করে ফেলেছে সে। শারমিন তখন ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিল। এখন তো মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রেখেছে।

বাথরুমের কাজ শেষ করে আবার বসার ঘরে এসে সোফায় বসলো সাগর। মগবাজারের এই বাসাটি তাকে গিফট করেছেন একটি জাতীয় দৈনিকের সিনিয়র সাব এডিটর সরকার আরিফ রব্বানি। গিফট মানে আপাতত থাকার ব্যবস্থা। বাসাটি রব্বানি সাহেবের এক খালার। উনারা ইংল্যান্ডের অধিবাসী হওয়াতে বাসাটি তত্ত্বাবধানের পুরো দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হয়। এ অবস্থায় সাদাত সালেহীর সঙ্গে পরিচয় হলো। ছেলেটির লেখার হাত খুবই ভালো। ওর লেখালেখির সঙ্গে তিনি আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। ছাত্ররাজনীতির সূত্র ধরে বর্তমানে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে ছেলেটিকে। দেশের স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে না রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। সাদাত সালেহী সাগর একটি ছাত্র সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছে। যদিও সংগঠনটির কোন রাজনৈতিক কার্যক্রম এখন আর নেই। কিন্তু রাজনৈতিক মামলা থেকে বেঁচে নেই অনেকেই। সাগর তাই পত্রিকায় ‘কাওকাব’ নামেই কলাম লেখালেখি করছে এখন। আপাতত তার দেশের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মামলা নিয়ে সাগরকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে না, বরং প্রতিপক্ষ সংগঠনের একটা গ্রুপেরও টার্গেট সে। বেশ কয়েকবার ‘হত্যা’ করার উদ্দেশ্যে তার উপর হামলা হয়েছে। এর মূল কারণ সাগরের লেখালেখি। দেশের সর্বাধিক প্রচারিত একটি নিউজ পোর্টালের মুক্ত কলামে ছিনতাই ও চাঁদাবাজি নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছিল সে। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কিছুটা এ্যাকশন নিতে দেখা যায়। সেই থেকে সাগরকে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হচ্ছে। একদিকে পুলিশি ঝামেলা, অন্যদিকে সন্ত্রাসী। নিজের শহর চট্টগ্রামে অসুস্থ মাকে পর্যন্ত দেখতে যেতে পারছে না সে। স্কুল জীবনে বাবাকে হারিয়ে যে বড়ো ভাইকে অভিবাবক হিসেবে পেয়েছিল তিনিও তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চান না। যোগাযোগ রাখবেনই বা কি করে। একজন সরকারি চাকরিজীবির ভাই গাড়ি পোড়ানোর মামলার আসামি, এটা কি কখনো ভাবা যায়। যদিও সাগরের বড়ো ভাই শাহজাহান খুব ভালো করেই জানেন এসব মিথ্যে মামলা।

সাগর এত এত সমস্যা নিয়ে চলছে যে এর মধ্যে শারমিনকে মনে করার মতোই কোন সময় তার হাতে নেই। কিন্তু মেয়েটি যেভাবে জ্বালাতন শুরু করেছে মাঝেমধ্যেই ওর ছবিটা দু’চোখে ভেসে ওঠে। ভাইবারের ম্যাসেজটা আবারও পড়ছিল সাগর। ‘মিস্টার সাগর, নিজেকে যতোই আড়ালে রাখার চেষ্টা করো না কেন, আমি তোমাকে ঠিক খুঁজে পাবো। – নদী।’ শারমিন কি আসলেই খুঁজে পাবে সাগরকে। সাগর কি কোনদিন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে? হঠাৎ হোয়াটসআ্যাপে একটি অডিও বার্তা এসে প্রবেশ করতেই থেমে গেল সাগরের ভাবনা। ‘সাগর সাহেব, আপনি আমাকে এই নিয়ে দুবার থাপ্পড় মেরেছেন তবু আমি কাঁদিনি। কাঁদিনি কারণ জানি আমি অন্যায় করেছিলাম বলেই আপনি আমাকে থাপ্পড় মেরেছেন। বিয়ে করে যেদিন ঘরে তুলে নিবেন তারপর থেকে প্রতিদিনই যদি আমাকে এমন করে থাপ্পড় মারেন তবুও আমি আপনার বউ হতে চাই। আমি আপনাকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি। আপনাকে ছাড়া আমার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।’ অডিওটি শোনার পর সেলফোনটি অফ করে দিল সাগর। এ নাম্বারটি শারমিনের কাছে গেলই বা কি করে! মেয়েটিকে সেই কবে প্রথম থাপ্পড়টি মেরেছিল সাগর, আজও মনে রেখেছে ও। কিছুক্ষণের জন্যে স্মৃতির সাগরে ডুব দিল সাগর।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ভূতের পুত || কামরুল আলম
ইউসুফ নবীর গল্প ।। কামরুল আলম
আবিদ সালমান-এর ময়না আবারও রাজকন্যা হতে চায়__রুমেল আহমদ
ছোটোদের গল্প : স্বপ্নের বই কেনা__এম আশরাফ আলী
নিঝুম দ্বীপের বাঁশি
টি টি আই ছাত্রাবাস ও রাতুলের তিনটি মাস

আরও খবর

Shares