Header Border

সিলেট, বুধবার, ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ ইং | ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) ২৬°সে

ধারবাহিক গল্প: স্বপ্ন ভাসে চোখে (৪র্থপর্ব)__কামরুল আলম

তখন বর্ষাকাল ছিল। বৃষ্টির কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছে না সাগর। বিকেল চারটায় একটা টিউশনি আছে তার। এখন চারটা পাঁচ বাজে। রিকসায় যেতে পনেরো মিনিট লাগে। অবশ্য যদি সময় মতো রিকসা পাওয়া যায়! আজকে আর কোন রিকসা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

একটু বৃষ্টি থামতেই বেরিয়ে পড়ে সাগর। রিকসা মেলে না। হেঁটে হেঁটেই যেতে থাকে। বিকেল পাঁচটা দশ মিনিটে শারমিনদের বাসায় গিয়ে পৌঁছে সে। বাসার নিকটে পৌঁছতেই আবার ঝম ঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়।
কলিংবেল বাজতে থাকে ক্রিং…, ক্রিং…। বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটা উপন্যাস পড়ছিল শারমিন। উপন্যাসের ভাষাটা একটু বেশি অশ্লীল। একটা জায়গায় গল্পের নায়িকাকে কাপড় খোলার অনুরোধ করছে নায়ক। কী অসভ্য কথারে বাবা! উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে, আসলে চটি গল্প ছাড়া আর কি!

কলিংবেলের শব্দে ওঠে দাঁড়ায় শারমিন। দরজা খুলে দেখে সাগর।
-কী ব্যাপার স্যার! আজ এত দেরি কেন? ওহ! আপনি তো বৃষ্টিতে ভিজে গেছেন।
ভিজে কাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকা সাগরের মুখে কোন কথা ফুটছিল না। শারমিনই আবার কথা তুললো।
-এই কাপড়টা পাল্টে নিন স্যার। নইলে নির্ঘাত জ্বর বাঁধাবেন। আপনি কাপড় পাল্টান, আমি আপনার জন্য চা নিয়ে আসছি।
একটি সার্ট ও লুঙ্গি সাগরের হাতে দিতে দিতে ভিতরে চলে গেল শারমিন। ফিরে আসে একটু পর গরম চা নিয়ে। সোফায় সাগরের পাশের সিটে বসে আবার কথা বলা শুরু করে।
-স্যার, আজকে আমার পড়তে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া বাসায়ও কেউ নেই।
-কেউ নেই মানে? সাগর চমকে ওঠে জিজ্ঞেস করে।
-মানে আম্মারা চলে গেছেন বেড়াতে। এখন শুধু আমি আর আপনি ছাড়া কেউ নেই। মুচকি হাসি হেসে হেসে সাবলীল কণ্ঠে বলে ফেলে শারমিন।
-ও, আচ্ছা। আমি তাহলে এখন আসি। বেরোতে যায় সাগর। শারমিন এসে ওর হাত ধরে ফেলে।
-না স্যার, এই বৃষ্টিতে আপনি যেতে পারবেন না। তাছাড়া আপনি ভাইয়ার লুঙ্গি ও সার্ট গায়ে দিয়েই চলে যাবেন বা কেন? আপনার প্যান্ট সার্ট পরে আসুন।
-ও, হ্যাঁ। আমি খেয়াল করিনি। শারমিন সাগরের হাত ধরে ভিতর ঘরের দিকে টেনে টেনে নিতে থাকে। হতভম্ব হয়ে পড়ে সাগর। সারা শরিরে অন্যরকম এক অনুভূতি খেলে যায় তার। ধীরে ধীরে হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু শারমিন আরো শক্ত করে তার হাত ধরে টানতে টানতে বেডরুমে নিয়ে যায় সাগরকে। সাগর কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা। শারমিন সাগরকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। বেঁচে থাকার মৃদু চেষ্টা করে সাগর। কেমন যেন একটা মোহের মধ্যে পড়ে যায় ধর্মকর্মে বিশ্বাসী সাগর। হঠাৎ টের পায় তার লুঙ্গির নিচে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। শারমিন জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে যায় সাগরকে। সাগর যথাসম্ভব এড়িয়ে যায়। বিছানার দিকে টানতে থাকে শারমিন। সাগর ঠাস করে একটা থাপ্পড় মারে শারমিনের গালে। তারপর দ্রুত প্যান্ট সার্ট পরে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এমনটা ঘটবে ভাবেনি শারমিন। অন্যকিছু আশা করেছিল সে।

সাগর টিউশনিটা ছেড়ে দেয়। শারমিনদের ফ্যামিলি থেকে যোগাযোগ করা হলে সে ব্যস্ততার কারণে ‘পারবে না’ বলে জানিয়ে দেয়। পরের বছর এএসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হয়। পত্রিকার পাতায় চোখ যায় সাগরের। গোল্ডেন এ প্লাস প্রাপ্ত ছাত্রী হিসেবে একটি ছবি ছাপা হয়েছে শারমিনের। সঙ্গে ছোট্ট একটি ইন্টারভিউ। ‘এ রেজাল্টের পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি’ এরকম একটি প্রশ্ন করা হয়েছে শারমিনকে অন্যান্য প্রশ্নের সঙ্গে। শারমিন বলেছে, ‘অবদান একমাত্র প্রাইভেট টিউটর সাগর স্যারের।’ সাগর এরপর আর কোনদিন শারমিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি। শারমিনের পরিবার থেকে বারকয়েক দাওয়াত আসে সাগরের। সে বরাবরই নানা অযুহাতে এড়িয়ে যায় ওসব। কিছুতেই আর শারমিনের সঙ্গে দেখা করতে চায় না সে।

@@@@@

সারাদিন একটানা বৃষ্টি হয়েছে। সন্ধ্যায় একটু থেমে আবার শুরু। শাম্মির মনটা আজ তেমন ভালো নেই। আগামীকাল থেকেই ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। প্রস্তুতি তেমন নেই, তাই পরীক্ষার আগের রাতটায় মনোযোগ দিয়ে পড়ছে সে।
ঢাকা নগরের খানিক দূরে একটি সবুজ শ্যামলে ঢাকা আবাসিক এলাকায় শাম্মিদের বাড়ি। একটু নিরিবিলি পরিবেশে বাড়িটি অবস্থিত। আশেপাশে তেমন জনবসতি গড়ে ওঠেনি এখনও। বাড়ি নির্মাণের জন্য রেডি প্লট পড়ে আছে, চলছে বড়লোকদের আবাসন বাণিজ্য। শাম্মিদের বাড়িটি দোতলা। পাঁচতলা ফাউন্ডেশন হলেও এটুকুই কম্পিøট করা হয়েছে। নিচতলায় একটি ভাড়াটে পরিবার ছিল, কিছুদিন হলো বাসা খালি করে ওরা অন্যত্র চলে গেছে। শাম্মির বাবা আকবর হোসেন চৌধুরী যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন দীর্ঘদিন থেকেই। বড়োভাই ফারুক হোসেন চৌধুরীও সম্প্রতি ফ্রান্সে চলে গেছে। পরিবার বলতে এখন তাই এ দোতলা বাড়িতে কেবল শাম্মি ও তার মা। কোন পুরুষ লোক বাড়িতে নেই। কাজের বুয়া ছাড়াও একটি কাজের ছেলে আছে অল্পবয়সী।
শাম্মি পড়ছিল আগামীকালকের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য। ওর পড়ার টেবিলটা জানালার পাশে। বাড়ির মূল গেটের সম্মুখভাগ স্পষ্ট দেখা যায় ওর পড়ার টেবিল থেকে। রাত তখন বারোটা বেজে আটচল্লিশ মিনিট। শাম্মি গড় গড় করে পড়া মুখস্থ করে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে হাই তুলছে ঘুমের টানে। হঠাৎ একটি মশা এসে বড্ড জ্বালাতন করতে থাকে শাম্মিকে। সে মশাটিকে তাড়িয়ে দিতেই জানালার দিকে দৃষ্টি দেয়। বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। জানালায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখাটা শাম্মির খুবই পছন্দের। মশা তাড়াতে গিয়ে তাই জানালার গ্রিল ধরে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো সে। ‘এবার শুয়ে পড়তে হবে’, ভাবছিল সে। এমন সময় দখেতে পেল তাদের গেটের ঠিক বিপরীত পাশে একটি কালো রঙের মাইক্রোবাস এসে থেমেছে। মাইক্রোবাস থেকে কতগুলো গুন্ডাটাইপের লোক ধরাধরি করে একটি যুবককে বের করে আনলো। গা শিউরে উঠলো শাম্মির দৃশ্যটি দেখে। চিৎকার করতে গিয়েও পারলো না, হাত-পা কাঁপছে ওর। বুকটা ধক্ ধক্ করে উঠলো। সে দেখতে পেল যুবকটাকে রাস্তার ধারে ফেলে দিয়ে দ্রুত সটকে পড়লো লোকগুলো। ঘটনাটি এত অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে গেল স্বপ্ন দেখছে নাকি বাস্তবে ঘটছে তা পরখ করার জন্য চিমটি কাটার সুযোগটাও পেল না শাম্মি।

মাকে ডাকলো শাম্মি। গভীর রাতে শাম্মির ডাকে ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। কি হয়েছে জানতে চাইলে কোন উত্তর না দিয়ে জানালার সামনে মাকে টেনে আনলো সে। মাকে দেখালো, আর বলে ফেলল পুরো ঘটনাটি যা এ পর্যন্ত দেখেছে। শাম্মির মায়ের মুখও শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। বাইরে তখনও প্রবলবেগে বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তাঘাট জনশূন্য। যুবক ছেলেটি বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। শাম্মি এবং ওর মা ধরেই নিল যে ছেলেটি মৃত। প্রশ্ন হলো, মৃতদেহটিকে খুনিরা তাদের বাসার সম্মুখে ফেলে গেল কেন?

বৃষ্টি কিছুটা হালকা হলে শাম্মির মা সাহস করে বলে ফেললেন, ‘চল্ নিচে গিয়ে দেখে আসি একটু।’ শাম্মিও মায়ের কথায় সায় দিল। দুজন মিলে তারা ডেডবডির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। চেহারা দেখে মনে হলো ভদ্রঘরের কোন ছেলেই হবে। পরণে সার্ট-প্যান্ট। সারা শরীরে ধারালো অস্ত্রের বেশ কিছু চিহ্ন। শাম্মির মা ছেলেটির নাড়ি পরীক্ষা করে দেখলেন। প্রাথমিক চিকিৎসাবিদ্যায় তাঁর হাতেখড়ি শিক্ষা রয়েছে। একসময় শাম্মির বাবার ফার্মেসির ব্যবসা ছিল, সেই সুবাদে তিনিও একটি ডিপ্লোমা কোর্স করে রেখেছিলেন।

নাড়ি পরীক্ষা করতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো শাম্মির মা সাহানা আক্তারের মুখম-ল। বেঁচে আছে ছেলেটি। আনন্দে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি, যেন কোন আপনজনকে ফিরে পেয়েছেন এইমাত্র। কঠিন পৃথিবীর বুকে মায়েদের মনটা এরকমই হয়, এমনটাই হওয়া উচিত। ব্যতিক্রম কেবল দু একজন মা যারা হাজার হাজার মায়ের বুক খালি করেও অট্টহাসি হাসতে পারেন। ডাইনি ছাড়া আর কি বলা যায় ওদের, কোন পশুর সঙ্গে তুলনা করাটাও বেমানান।
মা ও মেয়ে মিলে অজ্ঞান ছেলেটিকে টেনেটুনে দোতালায় নিয়ে এলেন। একটি বেডে শুইয়ে দিলেন পরম মমতায়। নিজের সেলফোনটা হাতে তুলে নিলেন শাম্মির মা, সাহানা আক্তার। ডায়াল করলেন ডা. আহমেদ জামিলের নাম্বারে। ডা. জামিলের বাসা শাম্মিদের বাসার নিকটেই। মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এই ডাক্তার আকবর সাহেবের বন্ধু মানুষ। তাই শাম্মিদের পারিবারিক ডাক্তারও বলা চলে। ফোন পেয়ে অল্পসময়ের মধ্যেই চলে এলেন ডা. জামিল। যুবকটিকে দেখেই একটি ইনজেকশন পুশ করলেন। বললেন, ‘ওর ভাগ্য খুবই ভালো বলতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিন রাজি থাকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে পাবে ছেলেটি। কিন্তু ছেলেটা কে?’

ডাক্তার এ প্রশ্ন করবেন, এটা আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন সাহানা আক্তার। তিনি তাই জবাবও একটা রেডি রেখেছিলেন। তাৎক্ষণিক উত্তর দিলেন, ‘আমার বোনের ছেলে।’ পরবর্তী প্রশ্নের কোন সুযোগ না দিয়েই বলে চললেন, ‘একটু আগে কে বা কারা আমার বাসার সম্মুখে এ অবস্থায় ফেলে যায় ওকে।’ ডাক্তার জামিল ‘আল্লাহ ভরসা’ বলে কিছু ওষুধের নাম ও খাবার নিয়ম লিখে দিয়ে বিদায় নিলেন। শাম্মির মা ছেলেটির সার্ট পরিবর্তন করে দিলেন। রক্তে ভেজা ছিল সার্টটি। সার্টের পকেটে একটুকরো কাগজ পাওয়া গেল চিরকুটের মতো। কৌতুহলবসত: চিঠিটি পড়তে লাগলেন সাহানা আক্তার। চিঠিতে একই সঙ্গে চোখ বুলাতে লাগলো শাম্মিও।
‘‘আম্মা,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আশা করি তোমরা সবাই ভালো আছো। আমি খুবই বিপদে আছি মাগো। শয়তানরা আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। কোথাও আত্মগোপন করার সুযোগটাও পাচ্ছি না। মোবাইল ফোনও ব্যবহার করতে পারছি না, মোবাইল ট্্র্যাক করে খুব সহজেই ওরা ধরে ফেলে। দু’দিন আগে হাবিব ও সোহেল নামে দুজনকে ধরে নিয়েছিল। ওদের খবর খবরের কাগজে পড়েছো নিশ্চয়ই। ওরা আমার খুব ঘনিষ্ঠজন ছিল মা। তোমরা সবাই আমার জন্যে দোয়া করবে। তোমাদের সাগর।’’
চিরকুটে কোন ঠিকানা লেখা নেই। চিন্তা পড়ে গেলেন সাহানা আক্তার। কে হতে পারে এই ছেলেটি? কোন সন্ত্রাসী টন্ত্রাসী নয় তো? ওর চিঠি পড়ে তেমনটা মনে হলো না। সন্ত্রাসী কখনোই তার মাকে এমন ভাষায় চিঠি লিখতে পারে না। ছেলেটি যে খুবই বিপদগ্রস্ত তা ওর চিঠি থেকেই বোঝা যায়। তাছাড়া ওকে তো মৃত ভেবেই সম্ভবত ফেলে গেছে এখানে সন্ত্রাসীরা। ভাবলেন তিনি। একই সঙ্গে এটাও ভেবে নিলেন, ওর জ্ঞান ফেরার পরও ওকে জনস্মুখে বের করা যাবে না। গোপনে আশ্রয় দিতে হবে ছেলেটিকে। ‘আমি খুবই বিপদে আছি মাগো, কোথাও আত্মগোপনের সুযোগটাও পাচ্ছি না’ কথাটি উনাকে বেশি ভাবিয়ে তুললো।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ভূতের পুত || কামরুল আলম
ইউসুফ নবীর গল্প ।। কামরুল আলম
আবিদ সালমান-এর ময়না আবারও রাজকন্যা হতে চায়__রুমেল আহমদ
ছোটোদের গল্প : স্বপ্নের বই কেনা__এম আশরাফ আলী
নিঝুম দ্বীপের বাঁশি
টি টি আই ছাত্রাবাস ও রাতুলের তিনটি মাস

আরও খবর

Shares