Header Border

ঢাকা, সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল) ৩০°সে

সিলেটি নাগরী : হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা

কামরুল আলম।। কোটি মানুষের পৃথিবীতে ভাববিনিময়ের জন্যে রয়েছে প্রায় ৭ হাজার ভাষা। এসব ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা তার নিজস্ব মহিমায় উজ্জ্বলতম স্থানটি দখল করে আছে। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য বাংলাভাষীরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। শুধুমাত্র ১৯৫২ সালে যে বাংলা ভাষার জন্যে আন্দোলন হয়েছে তা না। ১৯৬১ সালেও আসামের শিলচর শহরে বাংলা ভাষার জন্যে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছিল। ৬১ সালের ১৯ মে শিলচর শহরের তারাপুর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষার দাবিতে জনতার অবরোধ চলাকালে নির্মমভাবে গুলি চালায় পুলিশ। বায়ান্নে যেমন ঢাকায় ভাষার জন্যে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, শফিক, বরকতেরা তেমনি একষট্টিতেও শিলচরে জীবন দিতে হয়েছে ১১ জনকে। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্যে এত ত্যাগের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এ কারণেই বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে।
বাংলা ভাষা পৃথিবীতে ভিন্ন আরেকটি কারণে অদ্বিতীয় এবং নন্দিত ভাষা। পৃথিবীর বহু ভাষার যেখানে লিখিত রূপ অর্থাৎ বর্ণ বা লিপি নেই সেখানে বাংলা ভাষার রয়েছে দুটো বর্ণমালা বা লিপি। একটি আমাদের অতিপরিচিত বাংলা বর্ণমালা এবং অপরটি সিলেটি নাগরিলিপি। ‘সিলেটি নাগরী’ বাংলা ভাষার এক অনন্য সম্পদ যা বর্তমানে বিলুপ্ত হলেও একসময় মূল বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে সমানতালে সক্রিয় ছিল। সিলেটি নাগরিলিপির উৎস সিলেটকে ঘিরেই এবং এ লিপি সিলেট অঞ্চলেই বিস্তৃত ছিল। কারণ এটা ছিল সিলেট অঞ্চলের মানুষের মুখের বুলি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চতুর্দশ শতকে উদ্ভব ঘটে সিলেটি নাগরিলিপির। এ লিপির প্রবর্তকেরা বাংলা বর্ণমালার জটিল অধ্যায়গুলোকে পাশ কাটিয়ে খুব সহজপদ্ধতি সৃষ্টি করেছিলেন যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত বুঝতে ও শিখতে পারে। জানা যায়, ওই সময়ে ‘আড়াই দিনে নাগরী হিকা যায়’ বলে প্রবাদবাক্যেরও প্রচলন ছিল। নাগরিলিপিতে সেসময় রচিত হতো পুঁথিসাহিত্য। অবশ্য মধ্যযুগের সাহিত্য বলতে মূলত পুঁথিসাহিত্যকেই বুঝায়।
ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয় ব্রাহ্মীলিপি হিন্দুধর্মমতে ব্রহ্মার পক্ষ থেকে দেওয়া একটি লিপি। এজন্যে সিলেটের মুসলমানগণ এই লিপি ব্যবহার করে তাঁদের সাহিত্যরচনা কিংবা লেখালেখি করতে অস্বীকৃত হন। আর তাই ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁরা আরবি ও ফারসি হরফকে নিজেদের হরফ বলে ধরে নিয়ে আলাদা একটি লিপি তৈরি করে নেওয়ার তাড়না অনুভব করেন। এরই ধারাবাহিকতায় জন্ম হয় নাগরিলিপির। যদিও জন্মগতভাবে সিলেটি নাগরী একটি ব্রাম্মীলিপি এবং বিহারের কায়থীলিপি ও বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে এ লিপির ব্যাপক মিল লক্ষণীয়। ‘সিলেটি নাগরী’ সিলেট অঞ্চলের ভাষা হলেও এর বিস্তার ঘটেছিল বর্তমান ভারতের করিমগঞ্জ, শিলচর, বদরপুর, হাইলাকান্দি, ত্রিপুরা এমনকি আমাদের দেশের নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ এবং বি-বাড়িয়া অঞ্চলেও।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের মতে, হযরত শাহজালাল (রহ.) ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দিতে যখন সিলেট আগমন করেন তখন তিনিই এই লিপি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। নাগরিলিপিতে রচিত বিপুল সংখ্যক সাহিত্যকর্ম সুফিবাদ অনুসরণ করে বলে এই ধারণা সত্য বলেই মনে হয়। অন্যদিকে ড. আহমদ হাসান দানীর মতে, আফগান শাসনের সময় অর্থাৎ আফগানরা যখন সিলেটে অবস্থান করতেন, ওই সময়ই তাঁদের দ্বারা নাগরিলিপির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে। এ মতের সত্যতা পাওয়া যায় আফগান মুদ্রায় উল্লেখিত লিপি, যার সঙ্গে সিলেটি নাগরীর কয়েকটি বর্ণের মিল রয়েছে। তাছাড়া সিলেটে আফগান অভিবাসীও সংখ্যায় অনেক ছিলেন। এই দুই ব্যাখ্যা সিলেটি নাগরীর উদ্ভবের ইতিহাস হিসেবে প্রাধান্য পেলেও আরো কিছু মতামত প্রচলিত রয়েছে। যেমন- দেবনাগরীর সঙ্গে যেহেতু সিলেটবাসী পরিচিত ছিলেন তাই দেবনাগরীর আদলেই এই লিপি সিলেটিরা তৈরি করেছিলেন বলেও মনে করা হয়। আবার কারো কারো মতে, মুসলিম জনগণের মধ্যে সাধারণ লেখাপড়া চালু করার নিমিত্তে বঙ্গলিপি থেকেই নাগরিলিপি তৈরি করা হয়।
সিলেটি নাগরিলিপিতে রচিত সাহিত্যভা-ারের অপর নাম ‘ইসলামি সাহিত্য’। সিলেটি নাগরিলিপিতে লেখা প্রায় দুই শতাধিক পুঁথি গবেষকদের হাতে এসেছে বলে জানা যায়। এসব পুঁথির অধিকাংশই ইসলামধর্ম সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে রচিত। কয়েকটি প্রেম-প্রণয় কাহিনিনির্ভর এবং কিছু পুঁথি আত্মজীবনীমূলক। ইসলামি কাহিনির মধ্যে রয়েছে নামাজ, রোজা, সিরাত, ইসলামের ইতিহাস প্রভৃতি। সৈয়দ শাহনূর, আরকুম শাহ, শিতালং শাহ, শাহ আরমান আলী, শাহ আবদুল ওয়াহাব চৌধুরী প্রমুখ লেখকগণের প্রচুর সাহিত্যকর্ম ছিল নাগরিলিপিতে। এ লিপির সবচেয়ে জনপ্রিয় পুঁথি-কিতাবের নাম ‘হালতুন্নবী’। মুন্সী সাদেক আলী প্রণীত এ পুঁথিটি ১৮৬০ সালে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির প্রকাশক ছিলেন নাগরিলিপির পথিকৃৎ মুন্সী আবদুল করিম। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘ইসলামিয়া প্রেস’ এবং এটি সিলেট শহরের বন্দর বাজারে অবস্থিত ছিল। জানা যায়, হালতুন্নবীর ১০টিরও অধিক সংস্করণ বের হয়েছিল। সিলেটের ঘরে ঘরে সকাল-সন্ধ্যা এই পুঁথি পাঠ করার রেওয়াজ ছিল। আল-কুরআনের পর সিলেট অঞ্চলে এটাই ছিল সর্বাধিক পঠিত কিতাব।
সিলেটি নাগরিলিপিতে বর্ণ সংখ্যা ৩৩টি। বঙ্গলিপিতে অ থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত এ সংখ্যা ৪৯। জটিলতামুক্ত করতে নাগরিলিপিতে অনাবশ্যক বর্ণগুলোকে পরিহার করেছেন প্রবর্তকেরা। এতেই বুঝা যায় তাঁরা কতটা বিজ্ঞ এবং বিচক্ষণ ছিলেন। ধ্বনিবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা এক ধ্বনির জন্য একটিমাত্র বর্ণ বেছে নিয়েছেন। এজন্যে সিলেটি নাগরিলিপিতে ‘ই’ ও ‘ঈ’ দুটোর পরিবর্তে রয়েছে কেবল ‘ই’। অনুরূপভাবে ‘উ’ এবং ‘ঊ’ এর ক্ষেত্রে ‘উ’, ‘ন’ এবং ‘ণ’ এর ক্ষেত্রে ‘ন’, ‘শ’, ‘ষ’, এবং ‘স’-এর ক্ষেত্রে কেবল ‘শ’ রাখা হয়েছে। আমরা জানি, পৃথিবীতে সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা ইংরেজির বর্ণমালায় বর্ণ মাত্র ২৬টি। বঙ্গলিপি থেকে ১৬টি বর্ণ কমিয়ে নাগরিলিপিকে যারা সাজিয়েছেন তাঁদের মাথায় নিঃসন্দেহে এ বিষয়গুলো কাজ করেছে। বাংলায় যুক্তাক্ষর একটি বড়োসমস্যা। প্রায় দুই শতাধিক যুক্তবর্ণের ব্যবহার রয়েছে। নাগরিলিপিতে এ সংখ্যা কমিয়ে রাখা হয়েছে মাত্র ১৬টি।
বিলুপ্ত এই সিলেটি নাগরিলিপির অস্তিত্ব পুনরুদ্ধারে কাজ চলছে দেশে-বিদেশে। কম্পিউটারে সংযোজনের চেষ্টা চলছে নাগরি ফন্ট। ইতোমধ্যে অনলাইন ভার্সনে লেখার জন্য ইউনিকোড ভার্সন তৈরি হয়ে প্রচলিত রয়েছে। বাংলা কি-বোর্ডের ন্যায় নাগরি কি-বোর্ডের অ্যাপস ডাউনলোড দিয়ে মোবাইল ও কম্পিউটারে লেখা যাচ্ছে সিলেটি নাগরী। আমরা আশা করবো অচিরেই সিলেটি নাগরী ফিরে আসবে আপন মহিমায়। সিলেটিরা তাদের মায়ের ভাষায় যেমন কথা বলছে তেমনি লিখতেও পারবে সবকিছু।
তথ্যসূত্র : ‘সিলেটি নাগরী’-মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম উইকিপিডিয়া এবং বাংলাপিডিয়া।

লেখক : সম্পাদক- সোনার সিলেট ডটকম

এসএস/কেএ

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

পাপড়ি-করামত আলী তরুণ শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা
লেখক-ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান আর নেই
‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরেই অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে হবে’
ঈদে ছুটি বাড়ছে না, কর্মস্থলেই থাকতে হবে
ইতালিতে নামতে না পারা ১৫১ বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন
মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ আসছে, রদবদলও হতে পারে

আরও খবর

Shares