Header Border

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ ইং | ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) ২৯°সে

ঝাল-ছড়ার ডাকে সাতক্ষীরা ভ্রমণ ।। কামরুল আলম

[পর্ব-১ : পেছনের গল্প]
২০০৩ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। তখনও ব্যাপকহারে মোবাইল ফোনের ব্যবহার ছিল না। সিটিসেলই সর্বপ্রথম কমমূল্যে মোবাইল সেট বিক্রি শুরু করেছিল। আমার প্রথম মোবাইল নাম্বার তাই ছিল ০১১ সিরিজের। সেদিন দুপুরের দিকে সিলেট নগরীর একটি হাইস্কুলে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত শিশু-কিশোর পত্রিকা কচি’র একটি পাঠকসমাবেশ চলছিল। উল্লেখ্য যে ‘কচি’ নামে একটি ছোটোদের কাগজ ২০০১ সাল থেকে প্রকাশ করে আসছিলাম। বলতে দ্বিধা নেই প্রতি দুই মাস অন্তর পত্রিকাটি প্রকাশের পর এর বিক্রয় ও বিপণনের কাজটিও সম্পাদক হিসেবে আমাকেই করতে হতো। তো স্কুলে স্কুলে পাঠকসমাবেশ জমিয়ে সেখানে কচি পত্রিকাটি বিক্রি করার কাজেই আমি ব্যস্ত ছিলাম তখন। হঠাৎ করেই আমার মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠলো।
হ্যালো, স্লামালিকুম। কে বলছেন প্লিজ?
ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কামরুল, আমি নাজমুল হাসান বলছি। তোমার নাজমুল ভাই। সাতক্ষীরা…।
আরে নাজমুল ভাই আপনি! আমার নাম্বার পেলেন কোথায়?
কামরুল শোন ভাই তুমি এখন কোথায়? আমি তোমার বাসা থেকে নাম্বার সংগ্রহ করেছি।
.
ছড়াকার নাজমুল হাসানের সঙ্গে পরিচয় ১৯৯৭-৯৮ থেকে। ‘মাসিক ছড়ার ডাক’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেই তাঁকে জানতাম। তখন দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রায় সব পত্রিকায় লেখা পাঠাতাম। সম্ভবত দৈনিক ইনকিলাবের শিশুপাতা-সোনালি আসরে ‘লেখা আহবান’ বিজ্ঞপ্তির সূত্র ধরেই ছড়ার ডাক ও নাজমুল হাসান ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। পত্রিকাটি বের হতো সাতক্ষীরার শহিদ নাজমুল সরণী থেকে। আমার লেখা ছাপা হতো এবং পত্রিকাটির লেখককপি ডাকযোগে পাঠিয়ে দিতেন নাজমুল ভাই। মাঝে মাঝে ভাবতাম, সম্পাদকের নাম নাজমুল হাসান আবার ঠিকানাও শহিদ নাজমুল সরণী হয় কী করে? সম্পাদক সাহেব তো আর শাহাদত বরণ করেননি তাহলে নিশ্চয়ই উনি অন্যকোনো নাজমুলই হবেন! এক চিঠিতে সম্ভবত এ বিষয়ে নাজমুল ভাইয়ের সঙ্গে কথাও হয়েছিল, বিস্তারিত মনে নেই।
.
নাজমুল হাসান ভাই যখন বললেন, ‘আমি তোমার বাসা থেকে নাম্বার সংগ্রহ করেছি’ তখন আমি আকাশ থেকে পড়লাম। ধপ্পাস করে শব্দ হলো বুকের ভেতরে! আমার বাসা থেকে নাজমুল ভাই নাম্বার সংগ্রহ করবেন কী করে? তিনি থাকেন সাতক্ষীরা। তাহলে কি উনি অন্যকোনো নাজমুল ভাই?
আমি জানতে চাইলাম, আপনি কি মাসিক ছড়ারডাকের সম্পাদক নাজমুল ভাই?
আরে হ্যাঁ, আমি সাতক্ষীরা থেকে এসেছি। তোমার বাসায় গিয়েছিলাম। তোমার আম্মা আমাকে এই নাম্বার দিয়ে তোমাকে ফোন দিতে বললেন।
আপনি এখন কোথায়?
আমি এখন শাহজালাল উপশহরে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় আছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফ কোয়ার্টারে। ওখানে এসে তুমি আমাকে ফোন করো।
আমি তাই করলাম। দ্রুত সব কাজ বাদ দিয়ে উপশহরের সি-ব্লকে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনীতে প্রবেশ করলাম। পর্যায়ক্রমে দেখা হলো নাজমুল হাসান ভাইয়ের সাথে। পত্রযোগাযোগের সূত্রে আগে থেকেই জানতাম তিনি আমার সিনিয়র। তাছাড়া ফোনালাপের শুরু থেকেই ‘তুমি’ সম্বোধন করে তিনি আমাকে একান্ত আপন করে কাছে টেনে নিলেন যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সারাদিন নাজমুল ভাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়ালাম সিলেট শহরের বিভিন্ন জায়গায়। গেলাম কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্যসংসদে, অনেকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম তাঁকে। সিলেট পৌরসভাতেও নিয়ে গেলাম। তিনি কথা বললেন বদর উদ্দিন আহমদ কামরান সাহেবের সঙ্গে। নাজমুল ভাই সবাইকে তাঁর ভিজিটিং কার্ড দিয়ে শুরুতেই বলতেন, ‘আমি সাংবাদিক নাজমুল হাসান, কবি-ছড়াকার। এসেছি সাতক্ষীরা থেকে।’
সেদিনের স্মৃতি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। একসময় কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল সবকিছু। ২০০৯ সালে ফেসবুকে একাউন্ট খোলার পর থেকে ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগতে পরস্পর মিলিত হতে শুরু করি। নাজমুল হাসান ভাইকে ফেসবুকে খুঁজে পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় ৫ বছর! তাও ফেসবুকে খুব একটা সক্রিয় না থাকায় তাঁর সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ ছিলই না। ফোনালাপও হয়নি আর কখনও। বিশেষ করে মোবাইল নাম্বার পরিবর্তনের কারণে দুজনেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। মধ্যখানে আমি ‘ছড়াকণ্ঠ’ বের করে ডাকযোগে পাঠিয়েছিলাম দুটি কপি। তিনি পেলেন কি না তাও জানা হয়নি। ভার্চুয়াল যোগাযোগটা বাস্তব যোগাযোগের অনুরূপ হয় না। কেমন যেন হালকা হালকা লাগে। দূরের মানুষ কাছে চলে আসে, কাছের মানুষ দূরে চলে যায়!
.
২০১৫ সালে ‘সৃজনশীল ছড়া চর্চাকেন্দ্র-ঝাল’ এর ফেসবুকগ্রুপে যোগ দিয়ে পরিচিত হই ছড়াকার নূরুজ্জামান ফিরোজ ভাইয়ের সঙ্গে। পূর্বে তাঁর ছড়াপাঠ করেছি বিভিন্ন পত্রিকায়। কিন্তু ঝালগ্রুপে গিয়ে নতুন করে তাঁকে আবিস্কার করি। তখন তিনি দুহাত ভরে লিমেরিক লিখতেন। তিনি নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে নূরুজ্জমান ফিরোজের লিমেরিকগুলোর শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘ফিমেরিক’। চমৎকার অন্ত্যমিলে সাজানো ফিমেরিকগুলো পড়তে পড়তে একসময় তাঁর ভক্ত হয়ে যাই। আমিও লিখতে শুরু করি ‘কামেরিক’! আমি প্রচলিত পঞ্চপদী লিমেরিকের পরিবর্তে ছ’পদী ছড়া লিখে এর নামকরণ করি ‘কামেরিক’। কামেরিকের সংজ্ঞাটা এভাবে দিয়েছিলাম-‘লিমেরিকে পাঁচপদ কামেরিকে ছয়
কামেরিক ও লিমেরিক মন্দ তো নয়
কেউ ছয় কেউ পাঁচে
বিষয়টা একই ধাঁচে
কামেরিক করবে কি লিমেরিক জয়?
শুরু করে দেখি তবে কত মজা হয়?’
…এভাবে কামেরিক লেখা শুরু করার পর প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়ি। সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে কামেরিক সিরিজকে ‘ছপদী’ সিরিজে রূপান্তরিত করি এভাবে-
‘কামেরিকে ভুল ছিল কামেরিকে ভুল
কামেরিক লিখবো না আমি কামরুল
হতে পারে ছপদী তা
সকলেই কও যদি তা
লিখে লিখে ছপদীতে ফোটাবোই ফুল
কামেরিক ও ছপদী না, ছড়াটা-ই মূল!’
.
এভাবেই চলছিল ফেসবুকীয় ছড়াচর্চা। ঝালগ্রুপে একদিন দেখলাম ‘পাল্টা ছড়া’ লেখার ঘোষণা এসেছে। আমিও অংশ নিলাম। কয়েকটি পর্বে অনুষ্ঠিত হলো এ প্রতিযোগিতা। অনেকেই বিজয়ী হলেন। আমি মাত্র একটি পর্বে অংশ নিয়ে ‘শ্রেষ্ঠছড়াকার’ হিসেবে পুরস্কার নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলাম। ভেবেছিলাম এসব কর্মকাণ্ড ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু না, আমাকে অবাক করে দিলেন নূরুজ্জামান ফিরোজ। তিনি ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ‘ছড়াউৎসব’ করার ঘোষণা দিলেন ২০১৬ সালে। সেখানে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণও জানালেন। সিলেট থেকে আমরা ৪ জন শ্রেষ্ঠছড়াকার হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিলাম। আমি কামরুল আলম, ছড়াকার তোরাব আল হাবীব, ফ্রান্সপ্রবাসী ছড়াকার আহমদ সোহেল এবং তরুণ ছড়াকার মোয়াজ্জিম আল হাসান। আমি ঢাকায় যাওয়ার কথা জানালে আহমদ সোহেল তার ছোটোভাইকে পাঠালো আমার সাথে। মোয়াজ্জিম পারিবারিক সমস্যা দেখিয়ে যেতে চাইলো না। সঙ্গে নিলাম তার প্রতিনিধি হিসেবে আরেক তরুণ ছড়াকার রুমান হাফিজকে। জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তেন ‘ঝাল ছড়াউৎসবে’ মিলিত হলাম। প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করলাম। রফিকুল হক দাদুভাই, শাহাবদুদ্দীন নাগরী, রহীম শাহ, জগলুল হায়দারসহ সকলের সঙ্গে ভালো একটা সময় কাটানোর সুযোগ পেলাম সেদিন। যদিও সুকুমার বড়ুয়া এবং রফিকুল হক দাদু ভাইয়ের সঙ্গে বহু আগেই সিলেটে আড্ডা দেওয়ার সৌভাগ্য ঘটেছিল। সেদিন ঝালের উৎসবে যোগ দিয়ে অনেক প্রিয়মানুষের সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় একযুগ পর নতুন করে দেখা হয়েছিল বন্ধুবর ছড়াকার Torab Al Habib-এর সঙ্গেও।
.
২০১৮ সালে আবারও ফেসবুকসূত্রেই জানতে পারলাম ঝালের উদ্যোগে ছড়াউৎসব অনুষ্ঠিত হবে। স্বাভাবিকভাবেই ছড়াউৎসবে যাওয়ার জন্য হৃদয়ে জাগ্রত হলো তীব্র আগ্রহ। কিন্তু অনুষ্ঠানটি ঢাকায় নয়, সাতক্ষীরাতে হচ্ছে জেনে আগ্রহে ভাটা পড়লো। এতদূরের পথ পাড়ি দিয়ে কী করে যাবো? তখনই মনে পড়লো ছড়াকার নাজমুল হাসান ভাইয়ের কথা। আর এবারের উৎসবের সহ-উদ্যোক্তাও তিনি। ম্যাসেঞ্জারে তাঁকে নক করতেই তিনি মোবাইল নাম্বার দিয়ে বললেন, ‘কল মি’। এরপর সৃষ্টি হলো সাতক্ষীরা ভ্রমণের এক নতুন ইতিহাস। [চলবে…]

এসএসডিসি/ কেএ

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ইতালিতে নামতে না পারা ১৫১ বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন
করোনায় ২৪ ঘণ্টায় ৩৮ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৪৮০
দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা
এক বছর বয়সেই পাক্কা রাঁধুনী!
সুনশান শাহী ঈদগাহ! সিলেটের মসজিদসমূহে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত
যেভাবে পালন করবেন এবারের ঈদ

আরও খবর

Shares