Header Border

ঢাকা, শনিবার, ১১ই জুলাই, ২০২০ ইং | ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) ৩০°সে
শিরোনাম :

ঝাল ছড়ার ডাকে সাতক্ষীরা ভ্রমণ  ।। কামরুল আলম ।।

[পর্ব-২]
সৃজনশীল ছড়া চর্চাকেন্দ্র-ঝাল এবং মাসিক ছড়ার ডাকের উদ্যোগে আয়োজিত এই ছড়াউৎসবে যোগদানের ব্যাপারে শুরু থেকেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই। সুনামগঞ্জের ‘জাউয়া’ এলাকা থেকে ছড়াকার তোরাব আল হাবীব ভাইয়ের নেতৃত্বে ৬ জন ছড়াকার যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন জানতে পারি। উৎসবে যোগদানের কনফার্মেশনের ব্যাপারটাও বেশ মজার। ঝালের পরিচালক ছড়াকার নূরুজ্জামান ফিরোজের ইনবক্সে একটি ছড়া ও ছবিসহ পরিচিতি জমা দিলেই রেজিস্ট্রেশন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। নিবন্ধিত ছড়াকারের নামে একটি নজরকাড়া পোস্টার তৈরি করে ফেসবুকে নিজের টাইমলাইন ও ঝালগ্রুপে পোস্ট করেন নূরুজ্জমান ফিরোজ নিজেই। সেখান থেকে ছড়াকারগণ নিজেদের টাইমলাইনে শেয়ার করেন বিষয়টি। আমি যখন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছি যাবো কি না এ বিষয়ে তখন সিলেট থেকে ছড়াকার দেবব্রত রায় দিপন দাদা অংশ নিচ্ছেন বলে জানতে পারি ফেসবুকসূত্রেই। তোরাব আল হাবীব আমাকে ফোন করে কিছুটা উৎসাহ দেন যাওয়ার ব্যাপারে। আমি ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ঝামেলার কথা জানালে তিনি বলেন, আগে রেজিস্ট্রেশন করে ফেলুন। পরে একান্ত অসুবিধা হলে দেখা যাবে। অন্যদিকে তরুণ সাহিত্যকর্মী এস.পি সেবু ভারতের আসাম রাজ্য থেকে কয়েকজন কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে সাতক্ষীরা ছড়াউৎসবে যাচ্ছে বলে জানতে পারি। এস.পি আমাকে ফোন করে বলে, কামরুল ভাই আপনি আমাদের সাথে যাবেন। আমরা সিলেটের সবাই একসাথে যাবো।
.
আমি রেজিস্ট্রেশন করার পর ‘সিলেট থেকে অতিথি হয়ে যাচ্ছেন ছড়াকার কামরুল আলম’ শিরোনামের পোস্টারটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে অনেকেই যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আমার সঙ্গে যোগাযোগও করেন অনেকে। একে একে পোস্টার কনফার্ম করেন মোহাম্মদ আব্দুল হক, তরুণ ছড়াকার মিনহাজ ফয়সল, শাহজাহান শাহেদ, মৌলভীবাজারের কাওছার হামিদ, সিলেটের তালহা কাদির, মিজান রহমান ও মুয়াজ বিন এনামসহ বেশ ক’জন। এদের মধ্যে মুয়াজ বিন এনামের যাওয়া-না যাওয়াটা সবচেয়ে বেশি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দোদুল্যমান ছিল। কারণ ছড়াউৎসব সাতক্ষীরাতে ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে আর ৮ সেপ্টেম্বর তার অনার্স প্রথমবর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা! সে যাওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ দেখালেও আমি বারবার বাধা দিতে লাগলাম। বিশেষ করে সাতক্ষীরা থেকে ৭ তারিখ বিকালে রওয়ানা দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতেই ৮ তারিখ ভোর হয়ে যেতে পারে এবং ঢাকা থেকে যদিও ৫-৬ ঘন্টায় সিলেট পৌঁঁছানো যায় তবু যানজট বা গাড়ি নষ্ট হওয়ার বিড়ম্বনা তো থাকতেই পারে। আর ৮ তারিখ দুপুর ১টার সময় পরীক্ষা! শেষ পর্যন্ত দুপুর ১টা-২টার মধ্যে পৌঁছানো যায় কি না সেটাই সন্দেহ! নাছোড়বান্দা মুয়াজ বললো, আমি প্রবেশপত্র সঙ্গে করে নিয়েই বের হবো। সিলেট এসে সরাসরি চলে যাবো পরীক্ষার হলে।
.
আমার মাথায় শুরু থেকেই দীর্ঘ ভ্রমণের কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। কারণ সিলেট থেকে সাতক্ষীরা এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উৎসবে একটি ছড়াপাঠ করে ফিরে আসবো তা কী করে হয়? শুধুমাত্র একটি ছড়াপাঠের জন্য এত কষ্ট, এত খরচ কেন করবো। অতএব, যেতে যদি হয় একটু সময় নিয়েই যাওয়া দরকার। বিশেষ করে ছোটোবেলা থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণের খুব ইচ্ছে আমার। যদিও ইন্টারমিডিয়েটে পড়াকালীন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন, খাগড়াছড়ি ভ্রমণের পর বৃহত্তর সিলেটের বাইরে আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তাই সাতক্ষীরাস্থ ছড়াউৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ভ্রমণের একটি স্বপ্নছক এঁকেই ফেললাম আমি। এদিকে সাতক্ষীরা যাওয়াটা যে এত সহজ বিষয় না তা বোধহয় সিলেটের অনেক ছড়াকারই বুঝতে পারেননি। সবাই একসাথে যাওয়ার ব্যাপারে কথা বললেও কাউকেই যাওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। তোরাব আল হাবীব ঝাল-ছড়াউৎসবে যোগদান শিরোনামে একটি সাময়িক চ্যাটগ্রুপ খুলেন ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে। সেখানে ছড়াকার দেবব্রত রায় দীপনদা প্রস্তাব রাখেন, একটি হাইএস ভাড়া করে সিলেট থেকে রওয়ানা দিতে। আমি আপত্তি জানাই। এত দূরের পথ হাইএস বা প্রাইভেট গাড়িতে যাওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদজনক হবে। অন্যদিকে সবাই মোটামুটি ৭ তারিখের উৎসবে যোগ দিতে ৬ তারিখ রাতে রওয়ানা দেওয়ার চিন্তা করছিলেন। আমি প্রথমেই এ চিন্তায় ভেটো দিয়ে জানাই, গেলে অন্তত ২ থেকে ৩ দিন আগে রওয়ানা দিতে হবে। এতে করে আমরা সুন্দরবনসহ কিছু দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করার সুযোগ পাবো। ছড়াকার তোরাব আল হাবীব, কুতুব রহমানসহ জাউয়াবাসী ছড়াকারগণ এ বিষয়ে একমত হলেও সিলেটের যাত্রীগ্রণ নিশ্চুপ থাকেন। এদিকে দিন-ক্ষণ ঘনিয়ে আসছে কিন্তু কেউই যাওয়ার চূড়ান্ত কাজটি করছেন না দেখে আমি শেষ পর্যন্ত সবাই একসাথে যাওয়ার বিষয়টি মাথা থেকে সরিয়ে ফেলি। কারণ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি, তারা যেতে আগ্রহী কিন্তু যেতে পারছেন না। পোস্টার কনফার্মেশন করিয়ে সামিয়ক আনন্দলাভেই তাঁরা সন্তুষ্ট! আমার উপর কিছুটা হলেও নির্ভর করে যারা যেতে আগ্রহী ছিলেন এদের মধ্যে মুয়াজের যাওয়াটা তখনও কনফার্ম হয়নি। মিজান রহমানও হঠাৎ করে জানালো তার ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর ভার্সিটিতে পরীক্ষা। এরই মধ্যে মোহাম্মদ আব্দুল হক ভাই আমার অফিসে এসে যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ করেন। আমরা দুজন কিছু বিষয়ে খুব দ্রুত একমত হয়ে যাই। বিষয়গুলো হচ্ছে, রওয়ানা দিতে হবে ৪ তারিখ রাতে অথবা ৫ তারিখ ভোরে। হকভাই রাতের ভ্রমণে ঘুমের ব্যাঘাত সহ্য করতে পারেন না তাই ঠিক হলো ৫ তারিখ ভোরে রওয়ানা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমরা একমত হই ভ্রমণটা হবে পুরোপুরি ট্রেনে। দীর্ঘপথ বাসজার্নি করা মোটেই সুখকর হবে না। তৃতীয়ত, আমরা সিদ্ধান্ত নেই প্রথমে বিভাগীয় নগরী খুলনাতে গিয়ে উঠবো। খুলনা থেকে বাগেরহাট যাওয়ার ব্যাপারে আমার আগ্রহ থাকলেও হকভাই তা নাকচ করে দেন। যেহেতু ট্রেনের টিকিট পরবর্তীতে পাওয়া যাবে না তাই আমরা সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রথমে ৫ তারিখ সকালের কালনী এক্সপ্রেসে সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার জন্য দুটো টিকিট দুজনেই রেলস্টেশনে গিয়ে কিনে ফেলি। এ কথাটি ফেসবুকের চ্যাটগ্রুপে জানাতেই কয়েকজনের টনক নড়ে! তাহলে তো আর একসাথে যাওয়া হচ্ছে না! আমি জানালাম, এখনও সুযোগ আছে। একই ট্রেনের টিকিট সবাই কাটলেই তো হয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টি কেউই অনুধাবন করতে পারলেন বলে মনে হলো না। ঘটনা হলো আমরা সিলেট বিভাগের ছড়াকাররা তো যাচ্ছি ব্যক্তি-উদ্যোগে। এখানে কোনো সাংগঠনিক আয়োজন না থাকায় কেউ কাউকে নেতা মানতেও চাইনি আবার কেউ যেচে নেতৃত্ব দিতেও চাননি। ঝালগ্রুপের সক্রিয় এডমিন হিসেবে ছড়াকার তোরাব আল হাবীব জোর প্রচেষ্টা চালালেও তাঁর উপস্থিতি সিলেট শহরে না থাকায় এবং তিনি ডিসিশন মেকারের ভূমিকায় না যেতে পারায় শেষ পর্যন্ত একত্রে যাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিল হয়ে যায়। একত্রে যাওয়ার এই কর্মসূচি বাতিল হয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সিলেট এবং সুনামগঞ্জ থেকে ৩টি গ্রুপ পৃথকভাবে একত্রেই যাত্রা শুরু করে। সুনামগঞ্জ থেকে তোরাব আল হাবীবের নেতৃত্বে ৪ জন (নিবন্ধিত ২ জন বাদ পড়েন) বাসযোগে ৪ তারিখ রাত্রেই আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। আমি এবং আব্দুল হক ভাই যে ট্রেনে টিকিট করেছি সেই একই ট্রেনে যাওয়ার জন্য টিকিট করেন মিনহাজ ফয়সল, মুয়াজ বিন এনাম ও তালহা কাদির। আমাদের গ্রুপে ৫ জন ছড়াকার একত্রিত হলেও ফিরতিপথে মুয়াজ বিন এনামকে সঙ্গে রাখার সুযোগ ছিল না। কারণ পরদিন পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে সাতক্ষীরা-সিলেট ডাইরেক্ট বাসেই ফিরতে হবে। ছড়াকার নাজমুল হাসান ভাইকে বলে সেই বাসের টিকিট কনফার্ম করিয়ে তবেই আমরা রওয়ানা হই। বাসকর্তৃপক্ষ ১৪ ঘন্টা সময় লাগবে জানালেও পরে ১৯ ঘন্টায় মুয়াজকে ফিরতে হয়েছিল! যাই হোক আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, বাসে করে ফিরবে মুয়াজ বিন এনাম ও তালহা কাদির। মিনহাজ ফয়সল পৃথক ট্রেনে ফেরার চিন্তা করায় আমি এবং মোহাম্মদ আব্দুল হক ফিরতি পথে যশোর থেকে ঢাকার ট্রেনের টিকিট কাটি এবং ঢাকা থেকে সিলেটেরও দুজনের টিকিট কেটে একদম শান্তিমতো ঘর থেকে বের হই। ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সকাল ৭টায় সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে কালনী এক্সপ্রেসে রওয়ানা হই আমরা ৫ জন। একসঙ্গে টিকিট না-করার ফলে আমাদেরকে বসতে হয় ট্রেনের তিনটি বগিতে পৃথকভাবে। আমি ও হকভাই একসাথে, মুয়াজ ও তালহা একসাথে এবং মিনহাজ ফয়সল একা একটি সিটে। যাত্রার ৮ ঘন্টা আমি অবশ্য কতক্ষণ মুয়াজদের পাশে কতক্ষণ মিনহাজের পাশে বসে গল্প করে করে পার করে দিই। নিজের সিটে বসে থাকতে দেখা যায় হকভাইকে। মিনহাজ ফয়সল দু একবার আমাদের কামরায় এলেও তালহা কাদিরও হকভাইয়ের ন্যায় বসে থাকে নিজের সিটে। ৫ জনের মধ্যে একমাত্র মুয়াজ বিন এনামই ছিল প্রাণচঞ্চল। এদিক থেকে ওদিক কখন যে কোথায় যাচ্ছে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেন থামলে সেও নেমে পড়ে। আবার ট্রেন ছাড়ার সময় দৌড়ে ওঠার মজা লুটে। একবার তাদের কামরায় গিয়ে দেখি মুয়াজ সিটে নেই। ট্রেন একটি স্টেশনে অল্পক্ষণ থেমেই ছেড়ে যাচ্ছে। তালহা বললো, ভাই, মুয়াজ ভাই বলেছেন তাকে টেনে তুলতে। তিনি পান খেতে বেরিয়েছেন!
আমি বললাম, তাহলে ও পান খেতেই থাকুক। টেনে তোলার দরকার নেই। ওর সবকিছুই আমার ভালো লাগে শুধু এই পান খাওয়া ছাড়া।
কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলেও মুয়াজের কোনো খবর পাওয়া গেল না। ট্রেন ছুটে চলছে। তালহা অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।
ওকে সান্ত¦না দিয়ে বললাম, মুয়াজ কচিখোকা নয়। ট্রেনের কোনো না কোনো বগিতে উঠেছে, আমি নিশ্চিত। আর যদি ট্রেন মিস করেও থাকে তাহলে এখানেই আশেপাশে কারো বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেছে মনে করো।
এখানে কোথাও দাওয়াত খেতে গেছে মানে কী ভাই? অবাক হয়ে জানতে চাইল তালহা।
আমি মুচকি হেসে বললাম, সারাবাংলাদেশেই মুয়াজের আপনজন রয়েছে। ঢাকায় নেমেই টের পাবে! [চলবে]
এসএসডিসি/ কেএ

 

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ইতালিতে নামতে না পারা ১৫১ বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন
করোনায় ২৪ ঘণ্টায় ৩৮ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৪৮০
দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা
এক বছর বয়সেই পাক্কা রাঁধুনী!
সুনশান শাহী ঈদগাহ! সিলেটের মসজিদসমূহে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত
যেভাবে পালন করবেন এবারের ঈদ

আরও খবর

Shares