Header Border

সিলেট, সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২০ ইং | ১০ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) ৩০°সে

নতুন জামায়াত কতদূর যেতে পারবে?_শেখ রোকন

বেশ কিছুদিন ধরে ঢাকঢাক গুড়গুড়ের পর অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসা রাজনৈতিক দলটির নামও সম্ভবত চূড়ান্ত হয়নি। শনিবার রাজধানীতে এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের ব্যানারে লেখা ছিল ‘জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ কথাটি। এর সমন্বয়ক মজিবুর রহমান মঞ্জু সংবাদ সম্মেলনে যে ১৯ দফা ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন, তার শিরোনাম ‘স্বাধীন সত্তার বিকাশে অধিকার ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি’। ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে- ‘আলোচনা-পর্যালোচনা করে আমরা সংগঠনের নাম, কাঠামো, কর্মপদ্ধতি, লক্ষ্য ও কর্মসূচি চূড়ান্ত করব।’

অবশ্য নামে কী আসে যায়! রাজনীতির ক্ষেত্রে নীতি ও কর্মসূচি এবং তাতে জনসাধারণের আগ্রহ ও আস্থাই মুখ্য। গত কিছুদিনের সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নতুন রাজনৈতিক দলের উদ্যোক্তারা দুটি বিষয় প্রমাণে মরিয়া। প্রথমত, আর যাই হোক, তাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের আইনজীবী তাজুল ইসলাম। তার দাবি, তিনি কখনও জামায়াতে ইসলামীতে ছিলেন না। পেশাগত কারণে যুদ্ধাপরাধের মামলায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন (সমকাল, ২৮ এপ্রিল, ২০১৯)।

উদ্যোগটির ১৯ দফার ঘোষণাপত্রে বেশ কয়েকটিতেই এ ব্যাপারে অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা রয়েছে। যেমন ১৩ নম্বর দফায় বলা হয়েছে- ‘আমরা কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করব না। আমরা যে রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি তা হবে ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য, উন্মুক্ত একটি প্ল্যাটফরম।’ ১৭ নম্বর দফায় আরও স্পষ্ট করে, জামায়াতে ইসলামীর নাম ধরে, বলা হয়েছে- ‘জামায়াতে ইসলামীসহ বিদ্যমান কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ ঘোষণার সঙ্গে কার্যক্রমের মিল দেখাতেই সম্ভবত নতুন প্ল্যাটফরমের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতদের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শ, ধর্ম ও লিঙ্গ বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা হয়েছিল।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি নতুন প্ল্যাটফরম প্রমাণ করতে চায়, তা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান। লক্ষণীয়, সংবাদ সম্মেলনের ভেন্যু হিসেবেও বেছে নেওয়া হয়েছে হোটেল ‘একাত্তর’। ঘোষণাপত্রের অন্তত আটটি দফায় তারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামী ক্ষমা প্রার্থনা করুক- দলের ভেতর থেকে যারা এই দাবি তুলে ধরছিলেন, নতুন উদ্যোগের সমন্বয়কও তাদের মধ্যে ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে দলটির আরেক শীর্ষস্থানীয় নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এই দাবি পূরণ না হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। পরপরই মঞ্জুকে জামায়াত থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল।

কথা হচ্ছে, নতুন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে তত্ত্বগত আলোচনা যতটা সহজ, তার আলোকে মাঠে সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভবত ততটাই কঠিন। ক্ষমতাসীন দলের হালুয়া-রুটির ভাগ পেতে ভিড় সবসময়ই বড় থাকে; কিন্তু ক্ষমতার বাইরে থাকলে বা ক্ষমতার বাইরে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করতে গেলে টের পাওয়া যায় কত ধানে কত চাল। নতুন এই রাজনৈতিক দল এমন সময় গঠন হচ্ছে, যখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ আন্দোলনেও নতুন মুখ পাওয়া কঠিন। একাধিকবার ক্ষমতায় থাকা এবং অনুকূল পরিস্থিতিতে এখনও ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দল বিএনপিরই নেতাকর্মী সক্রিয় রাখতে রীতিমতো ঘাম ছুটে যাচ্ছে। তারপরও মজিবুর রহমান মঞ্জুর রাজনৈতিক ঢিল নানা কারণে নিস্তরঙ্গ রাজনৈতিক সরোবরে যে ঢেউ তুলেছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। বাড়তি আরও অন্তত তিনটি প্রশ্ন ঢাকাই রাজনীতির গলিঘুপচিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

প্রথম প্রশ্ন, সম্ভাব্য এই রাজনৈতিক উদ্যোগ কি মঞ্জুর সাবেক দল জামায়াতে ইসলামীতে ভাঙন তৈরি করবে? গত ফেব্রুয়ারিতে বহিস্কারের সময়ই মঞ্জুর সঙ্গে যাতে অন্যরা যোগ না দেয়, সেজন্য সাংগঠনিকভাবে মৌখিক ও লিখিত সতর্কতা জারি করেছিল দলটি। পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নাম পাল্টানোসহ কিছু বিষয়ে সংস্কার নিয়ে একটি কমিটিও করা হয়েছিল। অতীতেও দলটি কমিটি গঠন করে দলের ভেতর সংস্কারের দাবি চাপা দিয়েছে। এবারও সম্ভবত একই কায়দায় সামাল দিতে পেরেছে। মজিবুর রহমান মঞ্জুর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী যোগ দিয়েছেন, এখন পর্যন্ত তার প্রমাণ নেই। এমনকি এই ধারার ‘থিংঙ্ক ট্যাঙ্ক’ হিসেবে যাকে বিবেচনা করা হয়, সেই ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকও নতুন এই উদ্যোগে অন্তত প্রকাশ্য যোগ দেননি।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, নতুন এই রাজনৈতিক দলে জামায়াতে ইসলামীর বাইরে অন্য কোনো দলের নেতৃস্থানীয়রা যোগ দেবে? আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক সমাজে পরিচিত-আধাপরিচিত মুখের বাইরে ‘রাজনীতিক’ হিসেবে একজনকেই দেখা গেছে। আশির দশকে এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন আল আজাদ। তিনি পরে জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিকল্পধারায় যোগ দিয়ে মহাজোটের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। হতে পারে, সামনের দিনগুলোতে কয়েক দফা দলবদলকারী আরও কিছু এমন রাজনীতিক যোগ দিতে পারেন।

তৃতীয় প্রশ্ন, তরুণ সমাজ কি উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নতুন এই রাজনৈতিক দলে যোগ দেবে? শনিবারের ঘোষণাপত্রে তাদেরই নিশানা করা হয়েছে। যেমন এগারো নম্বর দফায় বলা হয়েছে- ‘প্রচলিত ও পরিচিত ধারার কেউ নয়, বাংলাদেশকে আজ নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসতে হবে একদল নতুন মানুষকে। তরুণ, সৃজনশীল, দুঃসাহসী একদল দুর্দমনীয় মানুষ।’ তরুণ সমাজের মধ্যে যে এ ধরনের আকাঙ্ক্ষার উদাহরণ হিসেবে নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে। বারো নম্বর দফায় তাই বলা হচ্ছে- ‘প্রচলিত রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নিদারুণ ব্যর্থতার মাঝেও আমরা কিশোর-তরুণদের আশাজাগানিয়া সফল বিদ্রোহ দেখেছি।’

স্বীকার করতে হবে, প্রচলিত ধারার রাজনীতি নিয়ে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে তরুণদের বিস্ম্ফোরণ হতে পারে সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু তারা কি কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে ইচ্ছুক? আরও ভেঙে বললে, মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলে যোগ দেবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি, তিনি ও তার এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে ইসলামপন্থিদের মধ্যেই আলোচনা-সমালোচনা বেশি। তিনি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটি বা মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন। সেই সূত্রে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা থাকতে পারে। কিন্তু জামায়াতের মতো একটি ‘রেজিমেন্টেড’ দল থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী ছুটিয়ে আনা কতটা কঠিন, সংস্কার চেয়েও বহিস্কার পর্যন্ত অপেক্ষা করা একজনের চেয়ে বেশি আর কে জানবেন?

অন্যদিকে, মজিবুর রহমান মঞ্জু মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ও অঙ্গীকারের কথা যতই বলুন না কেন, স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নিজের অতীত মুছে ফেলতে পারবেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া যুদ্ধাপরাধীদের প্রশ্নে তার অবস্থান নিয়ে ইতিমধ্যেই তরুণরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করছেন। এই অতীত নিয়ে বড়জোর জামায়াতের ‘সংস্কারপন্থি’ তরুণদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে পারবেন। তার ভাষায় ‘সৃজনশীল’ তরুণদের নয়। আমার ধারণা, যত দিন যাবে, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তার অতীত পরিচয়েই আরও গাঢ় রঙ লাগাতে থাকবে। ফিকে হতে দেবে না।

নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের আগাপাশতলা দৃশ্যমান হতে স্বভাবতই আরও কিছুদিন সময় লাগবে। এখন পর্যন্ত দেখে মনে হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর সংস্কার নিয়ে নাগরিক সমাজের একটি অংশের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, তাই যেন নতুন দলের ঘোষণাপত্রে মূর্ত হয়ে উঠেছে। ফলে এটাকে ‘জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ না বলে ‘জনআকাঙ্ক্ষার জামায়াত’ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
skrokon@gmail.com
লেখক ও গবেষক

সমকাল থেকে

এসএসডিসি/কেএ

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

আজিজ আহমদ সেলিমের মৃত্যুতে অনলাইন প্রেসক্লাবের শোক
ইছামতি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত স্মারক- ইছামতির আলো’র মোড়ক উন্মোচন সম্পন্ন
পাপড়ি-করামত আলী তরুণ শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা
লেখক-ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান আর নেই
‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরেই অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে হবে’
ঈদে ছুটি বাড়ছে না, কর্মস্থলেই থাকতে হবে

আরও খবর

Shares