Header Border

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ই জুলাই, ২০২০ ইং | ২৬শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) ৩০°সে
শিরোনাম :

নবীন ও তরুণ লেখকদের নতুন বই প্রকাশনা প্রসঙ্গে

কামরুল আলম।। অধিকাংশ তরুণ ও নবীন লেখকগণ বইমেলায় নিজের বই প্রকাশ করতে আগ্রহী। তারা চান তাদের বইটি মেলার প্রথম দিন থেকেই স্টলে থাকুক, এটা নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আলোচনা আসুক। পাঠক বই কিনুক বা না কিনুক অন্তত নেড়েচেড়ে যেন দেখতে পায় বইটি। পরিচিত-অপরিচিত পাঠককে অটোগ্রাফ দেওয়ার মনোবসানাও থাকে প্রায় সবার মধ্যে। এটাই স্বাভাবিক। আবার প্রত্যেকেরই চাহিদা বইটি যেন হয় উন্নতমানের, নিখুঁত, ঝকঝকে ছাপা, নির্ভুল বানান, বইয়ের সেটাপ-গেটাপটা যেন হয় অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এতসব চাওয়া আর একবুক স্বপ্ন নিয়ে তারা পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন এবং শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো প্রকাশনীর দ্বারস্থ হয়ে মুখোমুখি হন স্বপ্নভঙ্গের। কারো স্বপ্ন আংশিক ভাঙে আর কারো স্বপ্ন ভেঙে যায় পুরোপুরি। স্বপ্নের মৃত্যু ঘটলে লেখকেরা মর্মাহত হন। কেউ কেউ প্রতারিতও হন বিভিন্ন জায়গায় বই ছাপাতে গিয়ে।
.
বিগত ২ বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি তরুণ ও নবীন লেখকরা বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন সাধারণত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। অথচ মানসম্মত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো এই সময়ে সকল বইয়ের মুদ্রণ কাজ সমাপ্ত করে বইমেলার প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। ডিসেম্বরেই বাংলা একাডেমি বইমেলায় আবেদন করতে হয়। প্রকাশক বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা তখন ব্যস্ত হয়ে পড়েন বইমেলা নিয়ে। তরুণ ও নবীন লেখকেরা তাই দ্বারস্থ হন অপেক্ষাকৃত নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কাছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে এসব নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কম রেট ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ঘোষণা করতে থাকে। লেখকেরাও ছুটে আসেন পঙ্গপালের মতো। এ জাতীয় নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারীগণের অধিকাংশই আবার কোনো না কোনোভাবে সাহিত্যের সঙ্গেই জড়িত। তাই নতুন লেখকদের আস্থা ও বিশ্বাসে কোনো ধরনের সন্দেহ বা ঘাটতি তৈরি হয় না।
.
অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নবীন লেখকরা যেমন স্বপ্ন দেখেন নিজের বইটি বের হবে, বাজারে আসবে, আলোচিত হবে, সবাইকে অটোগ্রাফ দেওয়ার জন্য মেলায় দাঁড়িয়ে থাকবেন তেমনি তাদের স্বপ্নবাজ তরুণ ও নবীন প্রকাশকেরাও স্বপ্ন দেখেন এবারের বইমেলায় অনেকের বই প্রকাশ করে তারা এগিয়ে যাবেন। শত শত তরুণ লেখকের স্বপ্ন পূরণেও তারা পরিশ্রমে কার্পণ্য করেন না। দিন-রাত গাধার খাটনি খেটে বই প্রকাশ করতে থাকেন আর ফেসবুকে পোস্ট দিতে থাকেন অমুকের বই আসছে, তমুকের বই আসছে। কিন্তু ডিসেম্বর-জানুয়ারি এই মাত্র দুই মাসে এতগুলো বই কোনোভাবেই বের করা সম্ভব নয়; বিশেষ করে নতুন প্রকাশনীগুলোর জন্যে যাদের লোকবল ও অভিজ্ঞতা একেবারেই কম! তাই তো কারো বই বের হয়, কারো বই বের হয় না। কারো বই ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, কারোটা, দ্বিতীয় সপ্তাহে, কেউ বা একেবারে মেলার শেষ দিনে বই হাতে পান! বইয়ের ছাপার কাজ একসাথে হলেও এত লেখকের বই মেলায় আনার জন্যে বাঁধাইম্যানকে বলা হয় অন্তত ২০টি করে ৩০ জন লেখকের বই করে দিন। বাঁধাইম্যনরাও কথামতো কাজ করেন। এতে ২ জন লেখকের ৬০০টি বইয়ের কাজ শেষ না হয়ে ৩০ জন লেখকের ৬০০টি বই মেলায় চলে আসে। প্রকাশক ভাবেন, মান-সম্মান রক্ষা তো হলো! অমুকের বইটি মেলায় নিয়ে আসতে পেরেছি! এভাবেই টানাপোড়েন চলতে থাকে।
.
আবার অনেক লেখক ফেব্রুয়ারিতেও প্রকাশনীতে এসে আবদরা জানান তার বইটি যেন করে দেওয়া হয়। প্রকাশকও ব্যবসার স্বার্থে অথবা সাময়িক লোভে পড়ে কাজটি হাতছাড়া করতে চান না! শেষ পর্যন্ত লেজেগোবরে অবস্থা। প্রকাশক লাভ করলেন, নাকি লোকসান করলেন এই হিসাব লেখকদের করার কথা নয়। লেখকরা তাদের স্বপ্নভঙ্গের কারণে প্রকাশককেই দায়ী করেন, ক্ষুব্ধ হন প্রকাশকের বিরুদ্ধে! কেউ প্রকাশ্যে, কেউ ব্যক্তিগত পর্যায়ে আর অধিকাংশ লেখক সেটা বুকের মধ্যে চাপা মেরে রাখেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, তবুও কাউকে বলে বেড়ান না! মোট কথা সবার মধ্যেই একটি চাপা ক্ষোভ কাজ করে। মেলার শেষ দিন বই স্টলে তোলার পর লেখক দেখেন তাঁর ৫টি বই বিক্রি হয়েছে। তিনি ভাবেন যদি ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে বইটি মেলায় উঠতো ২৮ দিনে ১৪০টি না হোক অন্তত ১০০টি বই বিক্রি হতো। এ জন্যে প্রকাশককেই দায়ী করেন তিনি! কারণ পাণ্ডুলিপিটা প্রকাশকের হাতে তিনি জানুয়ারির প্রথমদিকেই দিয়েছিলেন! টাকাও দিয়েছেন, কিন্তু বই পেতে দেরি হলো!
.
শেষ কথা :
বই প্রকাশের জন্য লেখক এবং প্রকাশকের কিছু করণীয় রয়েছে যা অনুসরণ না করলে উপরের ঘটনাগুলোই ঘটতে থাকে।
লেখকের উচিত নির্ভুল ও উন্নতমানের বইয়ের জন্য হাতে যথেষ্ট সময় রেখে পাণ্ডুলিপিটি একজন দক্ষ ও শিক্ষিত প্রকাশক এবং মানসম্মত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে জমা দেওয়া। এ ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ ২০২০ বইমেলার জন্য পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার উত্তম সময় হচ্ছে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত। কেউ যদি এরপর পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে বই প্রকাশের স্বপ্ন দেখেন তাহলে তার উচিত হবে ২০২১ বইমেলার জন্য পাণ্ডুলিপিটি জমা দেওয়া। কারণ একটি বইয়ের সেটআপ-গেটাপ, মেকআপ, বানান ও সম্পাদনার কাজটা নির্ভুলভাবে করার জন্য প্রকাশককে অবশ্যই পর্যাপ্ত সময় দেওয়া দরকার। প্রকাশনার কাজ চলাকালীন সম্ভব হলে লেখক নিজেও বইটির খোঁজ-খবর রাখবেন। ফাইনাল সেটাপের পর প্রিন্টে যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই লেখকের একবার পুরো বইয়ের প্রুফকপি লাইন বাই লাইন পড়ে দেখা উচিত। এতে পরবর্তীতে প্রকাশক ও লেখকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আরেকটি বিষয় পাণ্ডুলিপি প্রকাশনীতে জমা দিয়ে অবশ্যই লেখক-প্রকাশকের চুক্তিবদ্ধ হওয়া উচিত। প্রকাশনীর প্যাডে সকল শর্তাবলী উল্লেখ করে এই চুক্তি সম্পাদিত হওয়া উচিত। দুজন সাক্ষীও থাকা দরকার দুইপক্ষের।

একজন প্রকাশকের জন্যেও কতগুলো বিষয় মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করা উচিত। কত দিনের মধ্যে প্রকাশনার জনবলকে কাজে লাগিয়ে কতটি বই প্রকাশ করা সম্ভব সেটা মাথায় রেখেই প্রকাশক পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করবেন। এক্ষেত্রে লেখকদের অনুনয়-বিনয়কে পাত্তা দিলে চলবে না। প্রকাশককে মনে রাখতে হবে মানহীন ১০০ বইয়ের চেয়ে মানসম্পন্ন ১টি বইই যথেষ্ট। পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের পর সেটি কম্পোজ করে প্রকাশক সেই বইয়ের আইএসবিএন সংগ্রহ করবেন, প্রচ্ছদ করার জন্য শিল্পীর নিকট পাণ্ডুলিপি জমা দিবেন অথবা বিষয়বস্তু জানাবেন। শিশুতোষ বইয়ের ক্ষেত্রে অলংকরণ শিল্পীর নিকট পাণ্ডুলিপি পাঠাবেন। প্রুফ রিডারকে দিয়ে প্রুফ দেখাবেন। সবকিছু হাতে চলে এলে বইটি সেটিং করবেন, সেটাপ-গেটাপ যাতে আকর্ষণীয় হয় সেদিকে খেয়াল করবেন। তারপর সিটিপি বা কম্পিউটার টু প্লেট বানাবেন। প্রেসে প্লেট জমা দিয়ে ভালো মানের কাগজ ক্রয় করে ছাপায় দিবেন। কভার ছাপা হয়ে গেলে লেমিনেশনের জন্য পাঠাবেন। বইয়ের জেল বাঁধাইয়ের জন্য জেল ছাপাবেন। ভেতরের ফরমাগুলো ছাপা হয়ে গেলে বাঁধাইম্যানের কাছে পাঠাবেন। বাঁধাইম্যান ফরমাগুলো ভাঁজ করে একসাথে করবে, তারপর সেলাই করবে। সেলাই শেষ হলে বাঁধাই করে মেশিনে চাপ মেরে রাখবে। প্রকাশক অবশ্যই সবগুলো বই (২০০ই হোক আর ১০০০ই হোক, সাধারণত নবীন লেখকরা ২০০-৩০০টি বই করে থাকেন) একসাথে রেডি করবেন। সুতা দিয়ে না বেঁধে বইগুলো প্যাকেটিং করবেন, সুতা বা দড়ি দিয়ে বাঁধলে উপর ও নিচের বইগুলো নষ্ট হতে পারে। বই ছাপার পর চুক্তি অনুযায়ী লেখকের কপিগুলো লেখককে দিয়ে দিবেন। বাকি বইগুলো বাজারজাত করণের জন্য পরিকল্পনা করবেন প্রকাশক। প্রকাশকের দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়, তিনি কপিরাইট অফিসে বই জমা দিবেন। বাংলা একাডেমিতে নতুন বই তালিকাভূক্ত করাবেন। সকল অনলাইন বুকশপে বইটি বিপণনের জন্য তালিকাভূক্ত করবেন এবং সর্বেোপরি বইমেলায় নিজেদের স্টল অথবা পরিবেশকের স্টলে বিক্রির জন্য আছে কি না নিশ্চিত করবেন। পরবর্তীতে বইটি সারাদেশে অথবা অন্তত লেখকের জেলার লাইব্রেরিগুলোতে অথবা অন্তত একটি লাইব্রেরিতে বিক্রির ব্যবস্থা রাখবেন। অথবা প্রকাশনীর নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে ডিসপ্লে করবেন।
.
একটা মানসম্পন্ন বই সঠিকভাবে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই কাজগুলো করা জরুরি। আমরা আশা করব তরুণ ও নবীন লেখকগণ এ বিষয়ে সচেতন হবেন, নিজের বই প্রকাশের ব্যাপারে যত্নশীল হবেন। আমরাও আমাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে বিগত ২ বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সকল দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন করে এগিয়ে যেতে চাই।

লেখক : স্বত্তাধিকারী, পাপড়ি প্রকাশ ও
সম্পাদক- সোনার সিলেট ডটকম

এসএসডিসি/ কেএ

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ইতালিতে নামতে না পারা ১৫১ বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন
করোনায় ২৪ ঘণ্টায় ৩৮ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৪৮০
দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা
এক বছর বয়সেই পাক্কা রাঁধুনী!
সুনশান শাহী ঈদগাহ! সিলেটের মসজিদসমূহে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত
যেভাবে পালন করবেন এবারের ঈদ

আরও খবর

Shares