Header Border

ঢাকা, শনিবার, ১১ই জুলাই, ২০২০ ইং | ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) ৩০°সে
শিরোনাম :

নবীন ও তরুণ লেখকদের নতুন বই প্রকাশনা প্রসঙ্গে-২

তরুণ ও নবীন লেখকদের যা জানা আবশ্যক
কামরুল আলম

প্রথমেই জানিয়ে রাখা ভালো, আমি একজন তরুণ ও নবীন লেখক হিসেবে এই লেখাটি তৈরি করেছি। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তরুণ ও নবীন লেখকদের একটি বড় অংশ আমাকে লেখকের পরিবর্তে প্রকাশক হিসেবেই গণ্য করা শুরু করেছেন। যদিও আমি নিজে কখনোই তেমনটা মনে করিনি। নিজের বই ঠিকঠাক প্রকাশের জন্যই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান খুলেছিলাম। আমি যখন সব পেশা ছেড়ে দিয়ে এই পথে পা বাড়াই তখনও প্রকাশনাকে ব্যবসা হিসেবে মাথায় রাখিনি। মুদ্রণ ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছি। ২০১৬ সালের শেষ দিকে ‘প্রাইম আইটি অ্যান্ড মিডিয়া করপোরেশন’ প্রতিষ্ঠা করে সিলেটের বন্দর বাজারে আমার গ্রাফিক্স ডিজাইন ভিত্তিক মুদ্রণ ব্যবসা শুরু হয়। তখন তরুণ ও নবীন লেখকদের অনেকেই আমাকে প্রকাশনী করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। আমি তাদের কথায় কর্ণপাত করিনি। পরবর্তীতে নিজের বই প্রকাশের জন্য বিভিন্ন প্রকাশনীর নিকট দ্বারস্থ হয়ে টের পাই, লেখক হিসেবে একটি বই প্রকাশ করা কত কঠিন একটি কাজ। যদিও সে সময় আমার দুটি প্রকাশিত গ্রন্থ ছিল। কিন্তু হাতে পাণ্ডুলিপি ছিল অনেকগুলো। বই প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন প্রকাশনীতে দৌড়-ঝাঁপ করে শেষ পর্যন্ত টের পেলাম, নতুন বা তরুণ লেখকদের জন্য ‘প্রকাশক’ আসেন একজন মুদ্রক হিসেবেই। লেখক টাকা দেন, প্রকাশক সেই টাকা দিয়ে প্রচ্ছদ ডিজাইন করান, কম্পোজ করান, প্রুফ দেখান বা দেখেন, ছাপাখানায় গিয়ে বই ছাপান। অতঃপর লেখকের নিকট বই হস্তান্তর করেন।

প্রশ্ন হলো লেখকরা কেন প্রেসে না গিয়ে এ ধরনের প্রকাশনীর দ্বারস্থ হয়ে থাকেন? উত্তর হিসেবে বলা যায়,
প্রথমত, প্রকাশকের নিকট পাণ্ডুলিপি জমা করার পর বই ছাপা করার পুরো দায়িত্ব তিনিই গ্রহণ করেন। এজন্য প্রিন্টিং প্রেসের অলি-গলিতে লেখকের আর যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কী ধরনের বইয়ে কী রকম কোয়ালিটি দরকার তা একজন লেখকের পক্ষে যাচাই-বাছাই করা অসম্ভব। যে কোনো একটি প্রিন্টিং প্রেস অথবা কম্পিউটারের দোকানে পাণ্ডুলিপি নিয়ে হাজির হলে পর্যাপ্ত টাকা দিয়ে মানসম্পন্ন বই বের করা কঠিন।

দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি লেখকরা প্রকাশকদের কাছ থেকে পেয়ে থাকেন তাহলো, যদিও নিজের টাকায় বই প্রকাশ করা হয়, তবুও বইয়ে তো একটি প্রকাশনীর নাম ব্যবহার করা দরকার। না হলে লেখক হিসেবে নিজের মধ্যে একটা অসহায় ভাব চলে আসতে পারে। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, আপনার বইটি কোন প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে? উত্তর হিসেবে আমতা আমতা করে বলতে হবে, কোনো প্রকাশনী না, আমার বইটি অমুক প্রেস বা কম্পিউটারের দোকান থেকে বের হয়েছে। কোনো কোনো লেখক অবশ্য নিজের নামে বা নিজের পছন্দীয় নামে একটি প্রকাশনীর নাম ব্যবহার করে এ যাত্রায় রক্ষা পেয়ে থাকেন। কতিপয় প্রেস বা কম্পিউটার গ্রাফিক্সের দোকানও এরকম রয়েছে যারা তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বই বের করার জন্য কেউ গেলে নামমাত্র একটি প্রকাশনীর লোগো ব্যবহার করে উক্ত বই প্রকাশ করে দিয়ে থাকে।

তৃতীয় ব্যাপারটি হলো, ব্যক্তিগতভাবে বই প্রকাশ করতে গেলে লেখক বা মুদ্রণ ব্যবসায়ী আরেকটি সমস্যার মধ্যে পড়েন। সমস্যাটি হলো ‘আইএসবিএন’ সঙ্কট। যদিও লেখক চাইলে নিজেই তার প্রকাশিতব্য গ্রন্থের আইএসবিএন সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু সেটা সময়সাপেক্ষ ও পদ্ধতি জানা না থাকায় লেখকগণ এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পন্ন করতে পারেন না। মুদ্রণ ব্যবসায়ীরাও একই সমস্যায় ভোগেন। ফলে তারা শেষ পর্যন্ত কোনো প্রকাশনীর দ্বারস্থ হন অথবা আইএসবিএন ছাড়াই নয়তো ভুয়া আইএসবিন দিয়ে বই প্রকাশ করেন।

চতুর্থ বিষয় হলো, একটি বই কোনো উল্লেখযোগ্য প্রকাশনী থেকে বের করলে সেই প্রকাশনী হয়তোবা বইমেলায় স্টল নিবে। বইমেলায় স্টলপ্রাপ্ত প্রকাশনী হলে লেখকের বইটিও বইমেলায় ডিসপ্লে হতে পারে। লেখক ব্যক্তিগতভাবে বই প্রকাশ করলে হয়তো এই সুবিধা পাবেন না।

সাধারণত প্রকাশকরা নতুন ও তরুণ লেখকদের বই কয়েকটি শর্তে করে থাকেন। এর প্রধান এবং প্রথম শর্তই হলো লেখকের টাকায় বই প্রকাশ করা হবে।এক্ষেত্রে বই ছাপানোর দায়িত্ব নেয় প্রকাশনী আর বইয়ের ছাপা খরচ সরবরাহ করেন লেখক। ধরা যাক, লেখকের ৩০০ কপি বই লেখকের টাকায় উৎপাদন করা হলো। লেখক ৩০০ কপি বই-ই নিয়ে গেলেন নিজের বাড়িতে। এক্ষেত্রে প্রকাশককে বই বিপণনের জন্য লেখক চাইলে কয়েকটি কপি দিতে পারেন। যে বইগুলো প্রকাশক বিভিন্ন মেলায় বিক্রি করবেন। বিক্রি হওয়া বইয়ের সংখ্যা অল্প হলে সাধারণত প্রকাশকরা এসব টাকার কোনো অংশই লেখককে দেন না। কারণ এই বইগুলো বিক্রি থেকে প্রাপ্ত টাকার অনুপাতে বিপণন খরচ অনেক বেশি হয়। তাই লেখকদেরও এসব ক্ষেত্রে ছাড়ের মানসিকতা থাকে বা থাকতে হয়।

লেখকদের আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার, একটি বই একজন লেখকের সারাজীবনের অর্জন। তাই বইটি শুধুমাত্র বইমেলা চলাকালীন সময়ে প্রকাশিত হলে এবং কয়েককপি বিক্রি হলেই তিনি সফলতা পেয়ে গেছেন আর বইমেলায় বিলম্বে প্রকাশিত হলে কিংবা বইমেলার পরে প্রকাশিত হলে বইটি মূল্যহীন হয়ে গেছে কিংবা তিনি একেবারেই ব্যর্থ হয়ে গেছেন এমনটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই। লেখক মারা গেলেও তার বই কিন্তু বেঁচে থাকে। তাই লেখককে শুধুমাত্র বইমেলাকেন্দ্রিক না হয়ে খেয়াল রাখা উচিত তার বইটি জাতীয় গ্রন্থাগার আর্কাইভসে জমা হলো কি না যেখানে বইটি কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। এছাড়া বাংলা একাডেমি তথ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গ্রন্থাগারে বইটির কপি জমা হলো কি না তাও লেখকের জেনে রাখা দরকার। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, নবীন লেখকরা এসব বিষয়ে থাকেন অতিরিক্ত উদাসীন। তারা কেবল তাদের বই মেলায় উঠলো কিনা, সেলফি তোলা সঠিকভাবে হলো কিনা, ৩ কপি বিক্রি হলে সেই ৩ কপির টাকা বুঝে পেলেন কি না এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। প্রকাশকগণ লেখকের বই যদিও লেখকের টাকা দিয়েই করে থাকেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাময়িক কিছু আর্থিক লাভও করে থাকেন কিন্তু সেই লেখকদের বইগুলো কাঁধে বহন করতে করতে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হন তা কিন্তু লেখকরা কখনও কল্পনাও করতে পারবেন না।

কোনো কোনো প্রকাশনী অবশ্য আরেক ধরনের শর্তে নতুনদের বই প্রকাশ করে থাকে। এই পদ্ধতিতেও বইয়ের মুদ্রণ খরচ সম্পূর্ণ লেখককেই বহন করতে হয়। যেমন ধরা যাক, লেখকের ৩০০ কপি বই প্রকাশিত হলো। এই ৩০০ কপির মুদ্রণ খরচ যা আসে তা লেখকের নিকট থেকে নিয়ে নেবে প্রকাশক। এর বাইরে আরও ২০ থেকে ২০০ কপি বই প্রকাশনীর অর্থায়নে ছাপা করা হয়। লেখক তার ৩০০ কপি বই বুঝে নিবেন। প্রকাশক বাড়তি ছাপা করা বইগুলো বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করবেন। এতে করে লেখকেরও একটি বাজার সৃষ্টি হলো। তবে সেই বইগুলোর লাভ সাধারণত প্রকাশক লেখকের সঙ্গে শেয়ার করেন না। সেটা একান্তভাবেই প্রকাশকের ব্যাপার।

তৃতীয় আরেকটি শর্ত বা পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রকাশনী বই করে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় লেখক প্রকাশকের নিকট পাণ্ডুলিপি হস্তান্তর করবেন। প্রকাশক বই ছাপার ব্যবস্থা করবেন। তবে প্রকাশক যে পরিমাণ বই ছাপাবেন তার একটি বড় অংশ লেখককে নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, ধরা যাক প্রকাশক ৩০০ কপি বই ছাপালেন, লেখক ২০০ কপি বই কিনে নিবেন। বাকি ১০০ কপি প্রকাশক বিক্রি করবেন এবং লাভও করবেন। সেই লাভের অংশটা প্রকাশক একাই ভোগ করবেন, লেখকের এখানে কোনোকিছু প্রত্যাশা করা অনুচিৎ। কারণ যেসব লেখকের হাজার হাজার কপি বই বিক্রি হয় না তাদের বই প্রকাশ করে প্রকাশকরা এভাবেই লাভ করে থাকেন। অন্যথায় প্রকাশকদের পথে বসতে হবে।

এসব পদ্ধতি বা শর্তের বাইরেও আরও কতিপয় শর্ত বা পদ্ধতি প্রকাশক এবং লেখকভেদে থাকতেই পারে। আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে লেখক-প্রকাশক চুক্তিবদ্ধ হয়ে সেরকম কিছু করতেই পারেন। তবে তরুণ ও নবীন লেখকদের মাথায় এটা থাকা উচিৎ, যাদের বই বিক্রি করে লাভ করার সম্ভাবনা নেই এরকম বইয়ে কোনো প্রকাশকই অর্থলগ্নি করতে চান না। অতিউৎসাহী কোনো কোনো প্রকাশক নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো মাঝেমধ্যে এমনটা করেন বা করার চেষ্টা করেন বটে। তবে শেষ অবধি ঠিকতে পারেন না।

নতুন ও তরুণ লেখকদের মধ্যে যারা বই প্রকাশে আগ্রহী তাদের অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা, অনেক বিশ্বাস ভঙ্গ হয়ে যায় বই প্রকাশ করতে গিয়ে। একজন প্রকাশক হয়ে আমি নিজে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি অনেককিছু। তাই আমার অনুরোধ, যারা বই প্রকাশের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ভালো করে জেনে-বুঝে পা ফেলবেন। [চলবে]

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ইতালিতে নামতে না পারা ১৫১ বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন
তোরাব আল হাবীব এর কিশোর কবিতার বই-একটা আকাশ একটা ঘুড়ি || শাহাদত বখত শাহেদ
করোনায় ২৪ ঘণ্টায় ৩৮ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৪৮০
দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা
শিশুসাহিত্য পুরস্কারের জন্য পাণ্ডুলিপি আহবান করেছে ‘পাপড়ি’
এক বছর বয়সেই পাক্কা রাঁধুনী!

আরও খবর

Shares