সোনার সিলেট

এই বদরুল আমার সন্তান হতে পারে না, আমি এই ঘটনার বিচার চাই: বদরুলের মা

Published: 07 10 2016   8:18:46 AM   Friday   ||   Updated: 07 10 2016   8:18:46 AM   Friday
এই বদরুল আমার সন্তান হতে পারে না, আমি এই ঘটনার বিচার চাই: বদরুলের মা

সোনার সিলেট ডটকম: খাদিজা বেগম নার্গিসকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা বদরুল আলমের জন্মদাত্রী মা দিলারা বেগম নিজেই এই বর্বরোচিত হামলার বিচার ও হামলাকারীর সাজা চেয়ে বলেছেন, এই বদরুল আমার সন্তান হতে পারে না। আমি এই ঘটনার বিচার চাই। তার শাস্তি দেখে মরতে চাই।

 

বুধবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মনিরজ্ঞাতি গ্রামের নিজ বাড়িতে নিজের ছেলের বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

 

তিনি আরো বলেন, খাদিজা বেগম নার্গিসের ওপর হামলার পর গণপিটুনির শিকার হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তার ছেলে যখন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তখন তার কাছে খবর আসে। কিন্তু বদরুলের পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের কারণে তারা এতোই লজ্জিত ও বিব্রত যে তাকে হাসপাতালে দেখতে যাননি পরিবারের কোন সদস্য। যাননি তিনি নিজেও ছেলেকে এক বারের জন্য দেখতে ।

 

বদরুলের মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমি অভাবী মানুষ। মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে লেখাপড়া করিয়েছি বদরুলকে। তার বাবা বিদেশ থেকে আসার পর অসুখে পড়ে জমি-জমা বিক্রি করে দেন। সে ভালো ছাত্র ছিল, তাই সংসারে সবাই তার দিকে তাকিয়ে ছিল। অনেক আশা-ভরসা ছিল তার উপর। কিন্তু এটা কী করলো বদরুল? এটা আমার সন্তান হতে পারে না। আমি এই হামলার বিচার চাই।

 

ছয় মাস আগে স্বামী হারিয়েছেন দিলারা বেগম। চার ছেলে এক মেয়ের মধ্যে বদরুল দ্বিতীয়। বদরুলের বাবা সৌদি আরবে উপার্জনের টাকায় পৈত্রিক ভিটেমাটিতে একটি পাকা বাড়ি তৈরি করেন। একসময় কিছু কৃষি জমি আর কয়েকটা গরুও ছিল তাদের। পরে বাব তিনি ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার খরচ মেটাতে জায়গাজমি সবই বিক্রি করে দিতে হয়। এখন সম্পদ বলতে শুধু এই বাড়িটাই আছে, আর কিছুই নেই।

 

বিলাপ করতে করতে বদরুলের মা বলেন, খেয়ে না-খেয়ে অনেক কষ্ট করে ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছি। ছেলেমেয়েদের মধ্যে বদরুলই লেখাপড়ায় ভালো ছিলো। তাকে ঘিরে ছিল সবচেয়ে বেশি আশা-ভরসা। অথচ সেই বদরুলই বুকটা ভেঙে দিল। সে এমন একটা জঘন্য কাজ করল, যার জন্য গ্রামে মুখ দেখাতে পারছি না। পরের মেয়েকে এমন অমানুষের মতো মারল কীভাবে! সে তো এমন ছিল না।

 

দিলারা বেগম আরো বলেন, যার ভেতরে মানুষের প্রতি মমতা নেই তার জন্য কোনো মায়া তারা দেখাতে চান না। ঘটনার পর থেকে পরিবারের কেউ লজ্জায় ঘর থেকে বের হচ্ছে না। বদরুলের মা আর কোনো কথা বলতে রাজি হলেন না। কাঁদতে লাগলেন।

 

বদরুলদের বাড়ীর একই আঙ্গিনায় আলাদা বাড়িতে বাস করেন বদরুলের চাচা আব্দুল হাই।

তিনি জানান, বদরুল খুব ভালো ছাত্র ছিল। দক্ষিণ খুরমা মনিরজ্ঞাতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও গোবিন্দগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসিতে ভালো রেজাল্ট করে সে। এরপর ভর্তি হয় শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার বাবা সৈয়দুর রহমানের খুব বড় স্বপ্ন ছিল বদরুলকে নিয়ে। তিনি বলতেন, আমার এই ছেলেটা বিসিএস দিয়ে বিরাট অফিসার হবে। ছয়মাস আগে তিনি মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর টানাপোড়নের সংসারে হাল ধরে রেখেছেন দর্জি দোকানী বড়ভাই। ছোট দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন এখন অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে এবং অন্যজন স্কুলে পড়ে। একমাত্র বোন ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ কলেজে স্নাতকের ছাত্রী। বদরুল নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ আয়েজুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিল।

 

বদরুলের কথা বলতে বলতে চাচা আব্দুল হাইয়ের চোখে পানি চলে এলো। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বললেন, আগে তো বদরুল ভালাই চলতো। কিন্তু তার ভেতরে যে কি আছে তাতো আমরা জানতাম না। আমরা তাকে সিলেটে পড়তে দিয়েছিলাম। বাড়িঘরের কণ কাজই তাকে দিয়ে করাতাম না। পরিবারের অনেক আশা-ভরসা ছিল তার উপরে। আর সে আজ বংশের নাম ডুবালো। এই কুলাঙ্গারের মুখ দেখতে চাই না আর।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  বদরুল আলম পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর খাদিজাদের বাসায় লজিং থেকে পড়াশোনা করতো। খাদিজাকেও সে পড়াতো, ওইসময়ই তাকে প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয় বদরুল। তারপরও সে মেয়েটিকে উত্যক্ত করতো। খাদিজার পরিবার জানতে পেরে তারা বদরুলকে অপমান করে লজিং থেকে তাড়িয়ে দেন।

 

উল্লেখ্য, গত সোমবার (৩ অক্টোবর) সিলেটে এমসি  কলেজের পুকুর পাড়ে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে শাবিপ্রবির ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম। সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর খাদিজার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরদিন মঙ্গলবার (৪ অক্টোবর) ভোরে তাকে ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওইদিন  অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকরা তাকে ৭২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।

এ ঘটনায় খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে সিলেটের শাহপরান থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে বদরুলকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন। গতকাল বুধবার বদরুলকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, প্রেমের প্রস্তাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে রাগের মাথায় তিনি খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে কোপান। জবানবন্দি দেওয়ার পর বদরুলকে কারাগারে পাঠানো হয়।

 

সোনার সিলেট ডটকম/ কেএ

printars line
সর্বস্বত্ব www.begum24.com কর্তৃক সংরক্ষিত
সোনার সিলেট