১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ রাত ৯:০৬

`তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ দাবি আদায়ের আন্দোলনের শেষ কোথায়?

কামরুল আলম
  • আপডেট রবিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৩,
২০১৫ সাল ছিল বিএনপির জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং ইয়ার। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের পর এক বছর গ্যাপ দিয়ে পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি। লাগাতার হরতাল ও অবরোধের কারণে এক পর্যায়ে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে এই কর্মসূচিটি। সর্বশেষ অনির্দিষ্টকালের জন্য সারাদেশে লাগাতার অবরোধ ঘোষণা করার পর বিএনপির পক্ষ থেকে তা অদ্যাবধি প্রত্যাহার করা হয়নি। বলা যায়, তাদের ঘোষিত সেই অবরোধ কর্মসূচি এখনও চলমান রয়েছে। মধ্যখানে ২০১৮ সালে নির্বাচনে অংশ নিয়ে একটি ‘উচিত শিক্ষা’ অর্জন করতে হয়েছিল দলটিকে। এবার ২০২৩ সালে এসে পুরনো সেই হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতেই ফিরে গেছে তারা । একদিনের হরতাল সহনীয় পর্যায়ের মধ্যে থাকে। তিনদিনের অবরোধও না হয় মেনে নেয়া যায়। কিন্তু নির্বাচনের এখনও তিন মাসের মতো সময় বাকি আছে। এই তিনমাস ঘন ঘন হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি দিলে অবস্থা সেই ২০১৫ সালের মতোই হতে পারে। এতে করে বিএনপিও যেমন তাদের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হবে তেমনি দেশের জনগণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে চরমভাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে একসময় কঠোর কর্মসূচি পালন করেছিল আওয়ামীলীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি। তখন ক্ষমতার মসনদে ছিল বিএনপি। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করেছিল বিএনপি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের মুখে যে কয়েকটি একতরফা এবং বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রচলনের আন্দোলনের পটভূমিতে। দাবি আগে উঠলেও ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করে তীব্র এক আন্দোলন শুরু করে। প্রবল আন্দোলন এবং সহিংসতার মুখে ১৯৯৫ সালের ২৪ নভেম্বর ৫ম জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন, সংঘাত এবং সহিংসতার ভেতর দিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায় তৎকালীন সরকার।
দেশে প্রথমবারের মতো অনির্বাচিত ব্যক্তির সমন্বয়ে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ গঠন করে এর অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলেছিল জামায়াতে ইসলামী। তারা ১৯৮৩ সালে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী এক জনসভায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ফর্মুলা দিয়েছিল। যে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা-সমালোচনা হয়, সেটি হচ্ছে ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামীলীগের আন্দোলন করা। তাও আবার জামায়াতের দেওয়া ফর্মুলার ভিত্তিতেই।
যাই হোক, বিভিন্ন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলনের অংশ হিসেবে হরতাল-অবরোধে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় জনজীবন স্থবির ছিল, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অর্থনীতি আর মানুষের জীবিকা। প্রাণহানির ঘটনাও কম ঘটেনি। যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম আর হরতাল-অবরোধ করেছিল আওয়ামীলীগ, সেই তারাই এখন আগেকার বিএনপির অবস্থানটি ধরে রেখেছে। তখন আওয়ামীলীগের দাবি ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাব না। বিএনপির বক্তব্য ছিল, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হতেই হবে, তত্ত্বাবধায়ক মানি না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই অবগত নয়। এই তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আওয়ামীলীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি তিনটি দলই সময়ে সময়ে আন্দোলন করেছে। মজার বিষয় হলো তিন দলই ক্ষমতায় থাকাকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সমর্থন করেনি। এখনও যেমন সমর্থন করছে না আওয়ামীলীগ।
১৯৮১ থেকে গণতন্ত্রের দাবিতে দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে৷ এরশাদ সরকারের পতনের পর সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ শাহাবুদ্দিন আহমদের অধীনে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ আনলেও পরে তিনি এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে শপথ গ্রহণ করেন। সেই থেকে পঞ্চম সংসদের যাত্রা শুরু হয়। বিএনপি সরকার গঠন করার কিছুদিন পর থেকেই বিরোধী দলগুলো সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজনের জন্য সরকারকে চাপ দিতে থাকে৷ সর্বপ্রথম জামায়াত এবং তারপর আওয়ামী লীগ ১৯৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল সংসদ সচিবালয়ে পেশ করে৷ এতে বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও নির্বাচনের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে সংযোজন করা উচিত ৷ কিন্তু বিএনপি প্রথম থেকেই এ দাবি অসাংবিধানিক বলে অগ্রাহ্য করতে থাকে। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন সংসদ ভবনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে ৷ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই রূপরেখাকে অসাংবিধানিক ও অবাস্তব বলে ঘোষণা করেন৷। বেগম জিয়া বলেন, একমাত্র পাগল ও শিশু ছাড়া কোনো মানুষের পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়।
৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪ আওয়ামী লীগ ও জামায়াত আলাদা সমাবেশ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয় ৷ সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকায় ২৮ ডিসেম্বর বিরোধী দলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগপত্র পেশ করেন ৷ পরবর্তীতে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বাতিল ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২ সেপ্টেম্বর থেকে একটানা ৩২ ঘণ্টা হরতাল পালন করেন তারা ৷ ৬ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা আবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ প্রস্তাব অসাংবিধানিক ও অযৌক্তিক বলে বাতিল করে দেন ৷ তিনি বিরোধী দলগুলোকে আলোচনার জন্য ডাকেন ৷ কিন্তু বিরোধী দলগুলো আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ৷ এরপর ১৬ নভেম্বর ১৯৯৫ থেকে একাধারে ৭ দিন হরতাল পালিত হয় ৷ হরতাল আর অবরোধের ফলে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চরম দুরবস্থার মুখোমুখি হয় ৷ সরকার ২৪ নভেম্বর ১৯৯৫ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে ১৮ জানুয়ারি ১৯৯৬ সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন ৷ পরে তারিখ পরিবর্তন করে নতুন তারিখ দেয়া হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৷ সব বিরোধী দল এ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় ৷ বিরোধী দলগুলোর প্রতিরোধের মুখে ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৷ দেশব্যাপী সহিংসতায় কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয় ৷ সারাদেশ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় নিপতিত হয় ৷ ২৪, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ বিরোধী দলের আহ্বানে দেশব্যাপী অসহযোগ পালিত হয় ৷ ৩ মার্চ ১৯৯৬ জাতির উদ্দেশে ভাষণে খালেদা জিয়া ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল আনার ঘোষণা দেন ৷
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষণায় ষষ্ঠ সংসদ বাতিল ও পদত্যাগ সম্পর্কে কোনো কথা না থাকায় বিরোধী দলগুলো তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে ৷ তারা ৬ মার্চ ১৯৯৬ হরতাল ডাকে ৷ ওই দিন সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের পুনঃনির্বাচনে সহিংসতায় ৯ জন নিহত হয় ৷ এরপর ৯ মার্চ থেকে সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী দলগুলো লাগাতার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে ৷ এই অসহযোগের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে রাষ্ট্রপতি সংলাপ আহ্বানের জন্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করেন ৷ প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর চিঠি বিনিময় হয় ৷ পাঁচ বুদ্ধিজীবী বিভিন্নভাবে সমঝোতার চেষ্টা করেন৷ কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
২৩ মার্চ ১৯৯৬ প্রেসক্লাবের সামনে সচিবালয়ের কর্মকর্তারা তাদের চাকুরির নিয়ম ভঙ্গ করে ‘জনতার মঞ্চ’ স্থাপন ও সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দেন । এমনকি ডেসকোর লোকজন গণভবনের বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ ১৯৯৬ সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল জাতীয় সংসদে পাস করে ৷ ২৮ মার্চ সচিবালয়ের ভেতরে ১৪৪-ধারা জারি করে এবং সচিবালয়ের ভেতরে-বাইরে সেনাবাহিনী, পুলিশ মোতায়েন করেও বিক্ষুব্ধ সচিবালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন বিএনপি সরকার ব্যর্থ হয় ৷
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবলিত বাংলাদেশের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধন আইন, ১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ ষষ্ঠ সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস হয় ৷ ২৮ মার্চ রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর এটি আইনে পরিণত হয়৷ এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে চতুর্থ ভাগে “২ক পরিচ্ছদ : নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার” নামে নতুন পরিচ্ছেদ যোগ হয় ৷
এরপর স্বাভাবিকভাবেই প্রতি ৫ বছর অন্তর নির্বাচিত সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে আসছিল। যথারীতি ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে জাতীয় পার্টি ও জাসদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। তারাও নিয়ম অনুযায়ী ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যাচ্ছিল।
কিন্তু বিপত্তি ঘটায় আওয়ামীলীগ। তারা ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সারাদেশে লগি-বৈঠার আন্দোলন ঘোষণা করে। ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর ঢাকার পল্টন এলাকায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের রক্তাক্ত সহিংসতা হয়। জামায়াতের সমাবেশে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট লগি-বৈঠা, লাঠি, রামদা এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এ হামলায় ৬ জন মানুষকে লগি-বৈঠা দিয়ে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, ২৮শে অক্টোবর পল্টন এলাকায় সহিংসতায় নিহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই ছিল জামায়াত-শিবিরের কর্মী। অন্যজন ওয়ার্কার্স পার্টির কর্মী বলে দাবি করা হয়। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার কথা, তার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিচারপতি কে. এম. হাসানকে নিয়োগ প্রদান না করা। তিনি এক সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগের মতে, কে এম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন সে জন্য বিএনপি সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতা ছাড়লেও অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। আওয়ামী লীগ ও মিত্র দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে, তিনি বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তার নির্দেশে চলছিল।
এর মধ্যে বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। যার ফলে পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি মঈন ইউ আহমেদের সহায়তায় ইয়াজউদ্দিন আহমেদ কর্তৃক জরুরি আইন জারি হয় এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে যে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল তা কার্যত পরিচালনা করেছে সেনাবাহিনী। ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে সরকার আভাস দিয়েছিল যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সেজন্য কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরি।
২০০৮ সালের ১৫ই জুলাই তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা নির্বাচেনের রোডম্যাপ ঘোঘণা করেন। সেখানে বলা হয়, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ডিসেম্বর মাসে।
অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মানুষ ভোট কেন্দ্রে হাজির হয়েছিল। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের সামনে ছিল ভোটারদের দীর্ঘ সারি। যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, সেজন্য ভোটকেন্দ্রগুলোতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব চোখে পড়েনি। নির্বাচন কমিশনের হিসেব অনুযায়ী ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে ৮৬.২৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৩০টি আসন। অন্যদিকে বিএনপি পেয়েছিল মাত্র ৩০টি আসন। শুধু তাই নয়, প্রাপ্ত ভোটের হারের ক্ষেত্রে ছিল বিশাল ফারাক। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪৮.১৩ শতাংশ ভোট এবং বিএনপি পেয়েছিল ৩২.৪৯ শতাংশ ভোট। সে নির্বাচনে দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভরাডুবি হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর। চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র দুটি আসনে জয়লাভ করেছিল দলটি। এছাড়া ভোট পেয়েছিল ৪.৬০ শতাংশ। বিএনপির এম সাইফুর রহমান, এম ইলিয়াস আলী, জামায়াতের মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো তুমুল জনপ্রিয় নেতারাও সংসদ সদস্য হতে পারেননি। সবমিলিয়ে অবাক করার মতোই ছিল সেই নির্বাচনের ফলাফল।
এরপর আদালতের মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। সে অনুযায়ী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচন বয়কট করে। সেই থেকেই চলছে বিএনপি ও জামায়াতের সরকার বিরোধী আন্দোলন। কিন্তু কোনোভাবেই যেন কুল-কিনারা পাচ্ছে না আন্দোলনকারীরা।
অবশেষে আবারও হরতাল-অবরোধে ফিরে এসেছে বিএনপি। এখন সাধারণ মানুষের একটাই জিজ্ঞাসা, এর শেষ কোথায়?
.
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরও সংবাদ
© All rights reserved © 2016 Paprhi it & Media Corporation
Developed By Paprhihost.com
ThemesBazar-Jowfhowo