Header Border

সিলেট, সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২০ ইং | ১০ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল) ৩০°সে

ক্ষুধা_খোরশেদ মুকুল

দ্বিপ্রহর পেরিয়েছে সে কবে! ছায়া প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। শিউলির মা রাবেয়া বেগম পিড়িতে বসে দরজায় হেলান দিয়ে আছে। চোখে তার অভাবের ছাপ স্পষ্ট পরিলক্ষিত। বুকের মধ্যে সাহারা।  চেহারায় স্ফুট খরা। এই পঙ্গুদেহ তার কাছে এক স্থির পাহাড়সম। দুপুরের খাবার এখনও অনিশ্চিত। জমজ দুই সন্তান ছয়বছরের বেলী ও শফি খাবারের জন্য ছটফট করছে। সকালেও মরিচ দিয়ে অল্প পান্তাভাত জুটেছিলো।  পেটে তাই যেনো কালবৈশাখী কিছুক্ষণ পরপর ভাত ভাত বলে হানা দিচ্ছে। “মা ভাত খামু” বাক্যটি প্রায় জিকিরে পরিনত হয়েছে। ”

 

একটুধৈর্য্য ধর বাপ, শিউলি এক্কুনি আইয়া পরবো” এই বাণী শুনে আসছে প্রায় ঘন্টা দুইএক ধরে। সময়ের সাথে ক্ষুধা সমানুপাতিক হারেই বাড়ে। পরিপাকতন্ত্র হজম হয়ে যাওয়ার উপক্রম।  তাই কিছুক্ষণ পর রাবেয়া বেগম তাদের পানি খেতে দেয় এবং সম্ভাব্য খাবারের আশার বাণী শুনাতে থাকে। মানুষ বিপদে পড়লে ধৈর্যহারা হয়ে যায়। সে বুড়ো কিংবা বুদ্ধিমান হোক না কেনো। খুব কম মানুষই এর ব্যতিক্রম।  আর এই অবুঝ বাচ্চাদ্বয় তাই খাবারের জন্য বারবার তাগাদা দেয়াতে মায়ের মুখ নি:সৃত কর্কশ ধ্বনির আক্রমনের শিকার হলো। কিন্তু ক্ষুধা না মানে গালিবুলি। তাই তারাও অস্থির প্রায়। ফুল বিক্রির একটা অংশ দিয়ে পলিথিনে কিছু চাল আর পাটশাক নিয়ে তখনই দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির আঙ্গিনায় হাজির হলো শিউলি। হাঁপাতেহাঁপাতে মাকে বললো – ” মা আইয়া পরছি,  এই লও খাবার”।  বলতে দেরী হয়নি তৎক্ষণাত দৌড়ে গিয়ে বেলী পাটশাক আর  শফি চাল নিয়ে তাদের মা’কে দেয়। রাবেয়া বেগমের মুখে বিদ্যুৎগতিতে ফুটে উঠলো সূর্যের হাসি। অমাবস্যাতেই পূর্ণিমাতিথি। মরুমনে যেনো তরুর সঞ্চার।

 

 

সভ্যতা,  সংস্কৃতি আর টাকার কাছ থেকে যে যতদূরে তাদের চাহিদাও কম। কারণ তারা এর মর্ম বুঝলেও ধর্ম অনেক আলাদা। পঙ্গু রাবেয়া বেগম খুঁড়িয়েখুঁড়িয়ে যায় চুলার নিকটে। চাল ধুইয়ে চুলায় তুলে দিয়েই শাক কাটতে বসলেন। আল্লাহ হয়তো তার হাত দু’টো একারনেই ভালো রেখেছেন।   মাঝেমাঝে ভাবে কেনো সেদিন স্বামীর সাথে মারা গেলো না। পরক্ষণেই সন্তানদের কথা ভেবে ঐসব ভুলে যায়। সাতপাঁচ ভাবতেভাবতেই শাক কাটা শেষ করেছে। ঘরে নেয় পর্যাপ্ত মশলাপাতি। থাকবেই বা কি করে এগুলো তো আর আকাশ থেকে নাযিল হয় না। অভাবও লজ্জা পায় এই দুর্দশা দেখে। একসময় যে বাড়িতে টিভি পর্যন্ত ছিলো আজ কি বেহাল দশা। টিভির কথা একারনেই বলছি শিউলির বাবা রিক্সাচালক হলেও শখিন মানুষ ছিলেন।

 

অবশেষে রান্না শেষ করে রাবেয়া বেগম তার তিনসন্তানকে খাওয়ার জন্য ডাক দিলো। শিউলি হাতমুখ ধুয়ে আসে। বাড়ির মাঝখানে একটা ছেঁড়া মাদুর বিছিয়ে খেতে বসেছে তারা তিনজন। রাবেয়া বেগম তাদের পাশে বসে যেনো পাহারা দিচ্ছে। রাফি এখনও আসেনি। রাবেয়া বেগম খুব দুশ্চিন্তাই আছে। কারণ গত দু’দিন তার টোকাই কাজ ভালো যায়নি। টাকাও পায়নি। তাই হয়তো আসছে না- এটাই তিনি মনে করছে। তার দুশ্চিন্তার আরেকটি কারন ইদানীং ময়লার স্তুপে মাথাকাটা লাশ কিংবা দেহবিহীন মুণ্ডু পাওয়া যাচ্ছে। তাই রাফির অনুপস্থিতি রাবেয়া বেগমকে অস্থির করে তুলেছে। আর ক্ষণিক পরপর বলছে – “আল্লাহই জানে পোলাডা আমার কই “?  শিউলি, বেলী আর শফি এমনভাবে ভাত খাচ্ছে যেনো স্বর্গীয় মান্না-সালওয়া খাচ্ছে । রাবেয়া বেগম তাদের ভাত বেড়ে দিচ্ছে। শিউলির অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি খেতে বসলেন না। খাবার শেষ হতে না হতেই আসরের আজান ভেসে আসলো। ভূগোল আকৃতির এই ঘরে আলোবাতাসের মতো শব্দ এমনকি চোরও অনায়াসে যাতায়াত করতে পারবে। যদিও এঘরে চোরের প্রশ্ন অবান্তর। খাবার শেষ করে শিউলি উঠে দাঁড়াতেই তার চোখ গিয়ে পড়ে হাড়ির দিকে। আর বুঝতে পারে তার মা কেনো তাদের সাথে খেতে বসেনি। বসে কি খাবে? হাড়িতে যে সব পোড়াভাত। রান্নার মাঝখানে লাকড়ি আনতে গিয়ে ভাতের এই অবস্থা!

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

আজিজ আহমদ সেলিমের মৃত্যুতে অনলাইন প্রেসক্লাবের শোক
ইছামতি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত স্মারক- ইছামতির আলো’র মোড়ক উন্মোচন সম্পন্ন
পাপড়ি-করামত আলী তরুণ শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা
লেখক-ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান আর নেই
ইতালিতে নামতে না পারা ১৫১ বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন
করোনায় ২৪ ঘণ্টায় ৩৮ মৃত্যু, শনাক্ত ৩৪৮০

আরও খবর

Shares