কবি মুকুল চৌধুরী এবং গীতিকার মুকুল চৌধুরী একই ব্যক্তি নন। সম্পূর্ণ আলাদা দুই ব্যক্তি। সম্প্রতি কবি মুকুল চৌধুরীর মৃত্যুসংবাদ ছাপতে গিয়ে কোনো কোনো পত্রিকা ‘কবি ও গীতিকার’ মুকুল চৌধুরী লিখেছেন মূলত এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত না থাকার কারণে।
দুই মুকুল চৌধুরীই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। তবে একজন ২০০২ সালে কলকাতায়, অপরজন ২০২৫ সালে সিলেটে।
গুগলে সার্চ দিলে উইকিপিডিয়ায় যে মুকুল চৌধুরীর নাম-পরিচিতি আসে তিনি গীতিকার মুকুল চৌধুরী। তিনিও সিলেটের কৃতিসন্তান এবং তিনিও ঢাকায় থাকতেন। অপরদিকে গুগলে সার্চ দিলে রকমারি ডটকমে যে মুকুল চৌধুরীর নাম আসে তিনি কবি মুকুল চৌধুরী। আমাদের প্রিয়কবি মুকুল চৌধুরী। তাঁর বাড়ি তো সিলেটেই, এমনকি তিনিও ঢাকায় থাকতেন। মজার বিষয় হলো দুই মুকুল চৌধুরী পারস্পরিক পরিচিতও ছিলেন। তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেছে। কবি মুকুল চৌধুরীকে একদিন আমি গীতিকার মুকুল চৌধুরী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি বিষয়টি। তাদের দুজনের মধ্যে দেখা হয়েছে নব্বই দশকে, রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদের সিঁড়িতে। ‘একই নামে দুজন লেখক’ হওয়ায় সমস্যা হতে পারে জেনেও তাঁরা তাঁদের নামে কোনো পরিবর্তন আনেননি। যদিও কবি মুকুল চৌধুরীর প্রকৃত নাম মনজুরুল করীম চৌধুরী। তবে তিনি সাহিত্যজগতে ‘মুকুল চৌধুরী’ নামেই বিখ্যাত। অন্যদিকে গীতিকার মুকুল চৌধুরী সিনেমা ও সংগীত জগতে বিখ্যাত। তিনি বেতার, টিভি ও সিনেমায় শতাধিক গান লিখেছেন। এসব গানের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি হচ্ছে, ‘ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’, তুমি আছো, সবই আছে’, ‘ও মাধবী গো, থেকো মোর অন্তরে’ প্রভৃতি।
গীতিকার মুকুল চৌধুরী এজিবি কলোনিতে (ঢাকা) থাকতেন। তিনি এবং আলম খান কলোনির মাঠে একসঙ্গে ফুটবল খেলতেন, তারপর তারা আত্মার বন্ধু হয়ে ওঠে। মুকুল ভাইব্রাফোন ভালো বাজাতেন এবং তিনি কবিতাও লিখতেন। একদিন আলম খান তাকে কিছু গান লেখার পরামর্শ দেন এবং পরদিন মুকুল কিছু গান লিখে তার কাছে নিয়ে আসেন। তার মধ্যে একটি ছিল ‘ও মাধবী গো থেকো মর অন্তরে’, যেটি তখন সুর করেছিলেন আলম খান এবং পরে গেয়েছিলেন রওশন আরা মুস্তাফিজ। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘কেউ কারো নয়’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’, ‘সখী তুমি কার’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘তুমি আছো সবি আছে’ এবং ‘সারেং বউ’ চলচ্চিত্রের জন্য ‘হীরামতি হীরামতি’ সহ আরও অনেক জনপ্রিয় গান রচনা করেন।
গীতিকার মুকুল চৌধুরী ‘ওরে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’ গানের জন্য সুপরিচিত যা বাংলাদেশী সংগীতের অন্যতম চিরসবুজ রচনা হিসাবে বিবেচিত। গানটির সুর ও প্রযোজনা করেছেন আলম খান এবং আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র সারেং বৌয়ের জন্য আব্দুল জব্বার গেয়েছেন। ১৯৭৬-৭৭ সালে যখন পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন তার চলচ্চিত্রের জন্য গান নিয়ে বসেন, তখন আলম খান মুকুল চৌধুরীকে একটি গানের জন্য কিছু লিখতে বলেন যা তিনি ইতোমধ্যে ১৯৬৯ সালে রচনা করেছেন কিন্তু কোথাও ব্যবহার করেননি। মুকুল চৌধুরী প্রথমে পুরো গল্পটি পড়েন এবং তারপর দুদিনের মধ্যে এই বিখ্যাত গানটির লিরিক্স নিয়ে আসেন। তিনি ২০০২ সালে কলকাতায় ছিলেন যেখানে তিনি একটি স্থানীয় ক্লিনিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
এদিকে কবি মুকুল চৌধুরী ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল সিলেটের একটি ক্লিনিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন।