সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চার জগতে এক আলোচিত ও সাহসী নাম ইমরানা বেগম। সিলেটের এই সংস্কৃতিকর্মী ও লেখক এখন কেবল তার সাহিত্যকর্মের জন্যই নয়, বরং মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে এক অসম লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। ‘সুরের পাঠশালা’র প্রতিষ্ঠাতা ইমরানা বেগমের ওপর একের পর এক নৃশংস হামলা ও মামলা তার জীবনকে করে তুলেছে চরম অনিশ্চিত, তবুও তার আপসহীন কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা সম্ভব হয়নি।
অসহিষ্ণুতার শিকার এক জীবন
গত ২০ জুন ২০২৫-এ নিজ শিক্ষার্থী টুম্পা চক্রবর্তীর ওপর মৌলবাদীদের অমানবিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করাই ছিল তার ‘অপরাধ’। সেই থেকে শুরু হয় এক দুঃসহ অধ্যায়। সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার, মর্যাদা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি নিরন্তর লেখালেখি করে আসছেন, যা উগ্রগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েছে। এই আদর্শিক অবস্থানের কারণে গত সেপ্টেম্বর মাসে তার নাচের স্কুল পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং নিজের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে এক সশস্ত্র হামলায় ইমরানা বেগম গুরুতর আহত হন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ইমরানা ১৯ দিন হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সাথে লড়ে ফিরে এসেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হামলার সময় খুনিরা ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহার করে তাদের জিঘাংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করে। এই নজিরবিহীন সহিংসতার পরেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আইনি মারপ্যাঁচে কণ্ঠরোধের চেষ্টা শারীরিক হামলায় দমানো যায়নি বলে এখন ‘আইনি কৌশল’ প্রয়োগ করছে একটি চক্র। ১৭ অক্টোবর আরিফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ইমরানা বেগম ও প্রকাশক লাসিন আরাফাতের বিরুদ্ধে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’-এর মামলা দায়ের করেছেন। অধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এই মামলা আদতে মুক্তচিন্তার ওপর একটি আইনি খাঁড়া এবং ইমরানা বেগমকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করার একটি সুপরিকল্পিত নীল নকশা।
নিজের ও পরিবারের ওপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনের ভয়াবহ স্মৃতি রোমন্থন করে ইমরানা বেগম জানান, “আমার ঘর পুড়িয়েছে, আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকে পিটিয়ে আহত করেছে, আজ মিথ্যা মামলার জালে বন্দি করার চেষ্টা চলছে—কিন্তু আমি জানি, সত্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ হয়ই। আমি সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারের যে কথা বলেছি, তা আমার অঙ্গীকার। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আমার কলম কোনো হুমকি বা মামলার ভয় পায় না।”
সুশীল সমাজ ও অধিকার সচেতন মহলের মতে, ইমরানা বেগমের ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। অবিলম্বে তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।