আদমজী ইপিজেডে সংঘর্ষ-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মামলা, ব্যবসায়ী ইউসুফসহ একাধিকজন আসামি

সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
  • আপডেট Friday, July 3, 2026,

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী ইপিজেড এলাকায় যুবদল ও শ্রমিক দলের দুই পক্ষের বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে দায়ের করা মামলায় স্থানীয় ব্যবসায়ী মোঃ ইউসুফ হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

তবে ইউসুফ হোসেনের পরিবার মামলাটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। পরিবারের বক্তব্য, ঘটনার সময় ইউসুফ সিদ্ধিরগঞ্জে ছিলেন না। জীবনের নিরাপত্তার আশঙ্কায় তিনি আগে থেকেই এলাকা ছেড়ে খুলনায় আত্মগোপনে ছিলেন।

পরিবারের আরও অভিযোগ, এর আগে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার ও কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া ইউসুফকে আবারও কারাগারে পাঠানো এবং তাদের পরিবারের ব্যবসা ও সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী করার উদ্দেশ্যেই দ্বিতীয় মামলায় তার নাম যুক্ত করা হয়েছে।

আদমজী ইপিজেড এলাকায় উত্তেজনা

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আদমজী ইপিজেড এলাকায় আধিপত্য ও বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে যুবদল ও শ্রমিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের লোকজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েকটি স্থানে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে।

পরবর্তীতে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলার আসামিদের তালিকায় ব্যবসায়ী মোঃ ইউসুফ হোসেনের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

‘ঘটনার সময় এলাকাতেই ছিলেন না ইউসুফ’

ইউসুফের পরিবারের দাবি, ঘটনার সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে সন্ধ্যায় বাজারে যাওয়ার সময় কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে ইউসুফের ওপর হামলা চালায়। তার চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষ এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।

এরপরও ইউসুফকে ফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে পরিবারের অভিযোগ।

নিরাপত্তার আশঙ্কায় তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ ছেড়ে খুলনায় তার খালার বাড়িতে আত্মগোপন করেন। পরিবারের দাবি, আদমজী ইপিজেড এলাকায় যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় মামলা হয়েছে, সেই সময় ইউসুফ খুলনায় অবস্থান করছিলেন।

পরিবারের প্রশ্ন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা একজন ব্যক্তিকে কীভাবে ভাঙচুর, মারামারি ও লুটপাটের মামলায় আসামি করা হলো।

আগে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইউসুফ

ইউসুফ হোসেনের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম মামলা নয়।

এর আগে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে দুটি পিস্তল ও ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। ওই ঘটনায় ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ইউসুফসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয় এবং ১০ এপ্রিল তাদের আদালতে পাঠানো হয়।

তবে ওই মামলাটিও সাজানো বলে দাবি করে আসছে ইউসুফের পরিবার।

পরিবারের অভিযোগ, ইউসুফকে ফাঁসানোর জন্য তার অজান্তে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অস্ত্র ও গুলি রেখে পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছিল।

ওই মামলায় দীর্ঘ দুই মাস ১০ দিন কারাভোগের পর ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পান ইউসুফ।

জামিনের পর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মার্কেট দখলের অভিযোগ

ইউসুফের পরিবারের দাবি, কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তিনি দেখতে পান তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের মালিকানাধীন দুটি মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে চলে গেছে।

এসব সম্পত্তি ফেরত চাইতে গেলে তাকে হুমকি দিয়ে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।

পরিবারটি এর পেছনে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি গাজী মনির এবং তার ছেলে আশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে।

তাদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই গাজী মনির ও তার ছেলের সঙ্গে ইউসুফের পরিবারের ব্যবসা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছিল।

১০ লাখ টাকা ও মাসিক চাঁদা দাবির অভিযোগ

ইউসুফের পরিবারের অভিযোগ, বিরোধের শুরুতে তাদের কাছে এককালীন ১০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

ইউসুফ ও তার বাবা মোঃ বিল্লাল হোসেন সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করার পর থেকেই তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি দখল এবং হত্যার হুমকি দেওয়া শুরু হয় বলে পরিবারের দাবি।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউসুফের বাবা বিল্লাল হোসেন সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার একজন ব্যবসায়ী এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। তিনি রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

অন্যদিকে ইউসুফ আদমজী ইপিজেড এলাকায় গার্মেন্টস জুট ব্যবসা, শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক খাবার সরবরাহসহ গার্মেন্টস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

বাড়িতে গুলি ও হামলার অভিযোগ

পরিবারের দাবি, চাঁদা ও হত্যার হুমকির বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করার পর ২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তাদের বাড়িতে হামলা হয়।

তাদের অভিযোগ, হামলাকারীরা বাড়ির দিকে দুই রাউন্ড গুলি চালায় এবং বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর করে।

এ সময় ইউসুফের বাবা বিল্লাল হোসেনকে মারধর করা হয় এবং মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন বলে পরিবার জানায়।

পরিবারের অভিযোগ, এসব ঘটনার পরও তারা পুলিশের কাছ থেকে কার্যকর নিরাপত্তা পায়নি।

দ্বিতীয় মামলাকে ‘পরিকল্পিত হয়রানি’ বলছে পরিবার

ইউসুফের পরিবারের দাবি, প্রথম মামলায় জামিনে মুক্তি পাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তার ওপর আবার হামলা হয় এবং এরপর দ্বিতীয় মামলায় তাকে আসামি করা হয়।

তাদের ভাষ্য, ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে দ্বিতীয় মামলাটি আলাদা কোনো ঘটনা নয়।

পরিবারের অভিযোগ, ইউসুফকে পুনরায় গ্রেপ্তার করানো এবং তার পরিবারের ব্যবসা ও সম্পত্তি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা বন্ধ করতেই তাকে নতুন মামলায় জড়ানো হয়েছে।

তারা আরও দাবি করেন, দ্বিতীয় মামলার সময় ইউসুফ আত্মগোপনে খুলনায় অবস্থান করছিলেন। তার অবস্থানের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন কি না, তা যাচাই করা সম্ভব।

রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ

ইউসুফের পরিবার সরাসরি অভিযোগ করেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না।

পরিবারের দাবি, গাজী মনির ও তার ছেলে আশিকুর রহমানের সঙ্গে বিরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে চাঁদার হুমকি, বাড়িতে হামলা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি দখল, অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় মামলায় জড়ানোর ঘটনা ঘটেছে।

তাদের আশঙ্কা, দ্বিতীয় মামলায় গ্রেপ্তার হলে ইউসুফকে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হতে পারে।

পরিবারটি প্রথম অস্ত্র মামলা এবং পরবর্তী ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলাসহ পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।

একই সঙ্গে আদমজী ইপিজেডের ঘটনার সময় ইউসুফ কোথায় অবস্থান করছিলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের অবস্থান এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করার দাবি জানিয়েছে পরিবার।

তবে গাজী মনির ও আশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ইউসুফের পরিবারের আনা অভিযোগ এবং দ্বিতীয় মামলায় ইউসুফকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানোর দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভাঙচুর, মারামারি ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ধরনের আরও সংবাদ

© All rights reserved © 2016 Paprhi it & Media Corporation
Developed By Paprhihost.com
ThemesBazar-Jowfhowo