মুক্তগদ্য
সমকামী বলেই কি তাকে মেরে ফেলতে হবে?
সমকামী বলেই কি তাকে মেরে ফেলতে হবে?
এই প্রশ্নটা আজ আর তাত্ত্বিক নয়।
এটা এখন বাস্তব, রক্তাক্ত, ভয়ংকর বাস্তব।
দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়—সমকামী হওয়াটা এখানে শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, অনেকের চোখে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। ফতোয়া, ওয়াজ, সামাজিক হুমকি, প্রকাশ্য ঘৃণার ভাষা—সব মিলিয়ে একটা বার্তাই ছড়ানো হচ্ছে:
“তুমি আমাদের মতো নও, তাই তুমি বাঁচার যোগ্য নও।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অধিকার কে দিল?
কোন আইন বলেছে, সমকামী হলে হত্যা করা যাবে?
কোন সংবিধান বলেছে, ভালোবাসার ধরন ঠিক না হলে প্রাণ কেড়ে নেওয়া বৈধ?
কোন ধর্ম মানুষ হত্যাকে নৈতিক দায়িত্ব বানিয়েছে?
তবুও আমরা দেখছি—
ওয়াজ মাহফিলে প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে, সমকামীরা সমাজের শত্রু।
তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে “ধর্মরক্ষা” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
আর যারা এই ঘৃণার বিরুদ্ধে কথা বলে, তারাও হয়ে যাচ্ছে টার্গেট।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই কথাগুলো আর প্রান্তিক নেই।
এগুলো এখন মাইক দিয়ে বলা হয়।
ভিড় হাততালি দেয়।
আর রাষ্ট্র প্রায়শই নীরব থাকে।
এই নীরবতাই আসলে হত্যার সবচেয়ে বড় সহযোগী।
সমকামী হওয়া কোনো অপরাধ নয়।
এটা কোনো রোগ নয়।
এটা কোনো ষড়যন্ত্র নয়।
এটা একজন মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ—যেমন কেউ বামহাতি, কেউ ডানহাতি। যেমন কেউ বিশ্বাসী, কেউ অবিশ্বাসী। এই ভিন্নতার জন্য কাউকে হত্যা করার দাবি উঠলে, সেটা শুধু সমকামীদের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়—এটা পুরো সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ।
আজ যদি বলা হয়, “সমকামী বলেই তাকে মেরে ফেলতে হবে”,
কাল বলা হবে, “ভিন্ন মত বলেই তাকে মেরে ফেলতে হবে”,
পরশু বলা হবে, “ভিন্ন বিশ্বাস বলেই তাকে মেরে ফেলতে হবে”।
এই যুক্তির শেষ কোথায়?
আসলে প্রশ্নটা সমকামিতা নিয়ে নয়।
প্রশ্নটা ক্ষমতা নিয়ে।
কে ঠিক করে দেবে, কে বাঁচবে আর কে মরবে?
ধর্মের নামে, নৈতিকতার নামে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে—এই ক্ষমতা কেউ পায়নি।
যারা সমকামীদের হত্যার কথা বলে, তারা আসলে একটি ভয়ভিত্তিক সমাজ তৈরি করতে চায়। যেখানে মানুষ নিজের পরিচয় লুকাবে, কথা বলবে না, মাথা নিচু করে বাঁচবে। এই সমাজে নিরাপদ থাকবে শুধু শক্তিশালীরা।
কিন্তু একটি দেশ ভয় দিয়ে টেকে না।
একটি সমাজ ঘৃণা দিয়ে টেকে না।
সমকামীদের বাঁচার অধিকার মানে সমাজ ভেঙে যাওয়া নয়।
বরং কাউকে হত্যা না করার সিদ্ধান্তই একটি সমাজকে সভ্য করে।
তাই প্রশ্নটা আবার করতে হয়—
সমকামী বলেই কি তাকে মেরে ফেলতে হবে?
উত্তরটা খুব সহজ।
না।
এটা কোনো মতামত নয়।
এটা মানবিকতার ন্যূনতম শর্ত।
আজ যদি আমরা এই “না” বলতে না পারি,
তাহলে কাল আর কারও জন্যই নিরাপদ থাকবে না।