বাংলাদেশের একজন প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর, লেখক ও ব্লগার রুবি আক্তার আজ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। ধর্মীয় গোড়ামি, নারীর প্রতি বৈষম্য এবং ধর্মের নামে ব্যবসা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কলম ধরার অপরাধে তাকে টার্গেট করেছে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী। প্রাণনাশের হুমকি থেকে শুরু করে রক্তাক্ত হামলা এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া পর্যন্ত এক নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়েছেন তিনি। তার পরিবারও এই সহিংসতার বাইরে নেই—প্রাণনাশের আশঙ্কায় তারা আজ গৃহহীন, নিঃস্ব, নিরাপত্তাহীন।
যুক্তির কণ্ঠস্বর রুবি আক্তার, পিতা মৃত জাহাঙ্গীর সিকদারের কন্যা, জন্ম ও বেড়ে ওঠা হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলায়। পেশায় একজন লেখক ও ব্লগার। তিনি www.rubiakterblog.com এই ব্লগ থেকে নিয়মিত লেখালেখি করতেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি, নারীদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, এবং ধর্মের নামে প্রতারণা ও ব্যবসার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার লেখায় স্থান পেয়েছে সমাজের অন্ধকার দিক, যা বহু প্রথাগত চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
রুবির লেখা “ধর্মের অন্তরালে” এবং “ধর্মীয় আবেগ এবং ব্যবসা”—এই দুটি বই সমাজে সাড়া ফেলে। বই দুটিতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্মকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কীভাবে নারীদের দমন করতে ধর্মের অপব্যাখ্যা প্রয়োগ করা হয়।
গত ৩ জানুয়ারি রুবি আক্তারের ওপর প্রথম বড় হামলাটি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, হিজবুত তাওহীদ এবং দেওয়ানবাগীর অনুসারী সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধভাবে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল। রুবি আক্তার গুরুতর আহত হন এবং টানা ১৫ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়েন।
এই হামলার পেছনে তার লেখালেখিকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে তিনি বলেন, “আমি ধর্মের অপব্যবহার আর নারীর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে লিখি বলে তারা আমাকে থামিয়ে দিতে চায়।”
৮ জানুয়ারির ভয়াবহতা: ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, পরিবারের ওপর হামলা
শুধু রুবি আক্তারই নয়, তার পরিবারও এই হামলার টার্গেট। ৮ জানুয়ারি বিকাল ৩টার দিকে একটি সন্ত্রাসী দল রুবি আক্তারের বাড়িতে হামলা চালায়। প্রথমে তারা ব্যাপক ভাঙচুর করে, এরপর ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় তার পরিবারের একাধিক সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হন। ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
এ সম্পর্কে রুবি বলেন, “আমার পরিবার আর আমি কোথাও নিরাপদ নই। তারা আমাকে মেরে ফেলতে চায়, কারণ আমি প্রশ্ন করি। আমি লিখি।”
আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে হতাশা: থানায় অভিযোগ নেয়নি পুলিশ
রক্তাক্ত অবস্থায় রুবি আক্তার স্থানীয় থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে চান। কিন্তু সেখানেও তিনি হয়রানির শিকার হন। থানা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। কোনো মামলা রেকর্ড করা হয়নি। বরং রুবি অভিযোগ করেন, থানার কর্মকর্তারা ঘটনাকে গুরুত্বহীন করে তোলার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, “আমি বারবার অনুরোধ করেছি। বলেছি, আমার প্রাণ হুমকির মুখে। কিন্তু পুলিশ চোখ বুঁজে ছিল। কেউ শুনেনি। আজও আমার কোনো অভিযোগ থানার খাতায় জায়গা পায়নি।”
মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একাংশ বলছে, এটি শুধু একজন লেখকের ওপর হামলা নয়, বরং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। অথচ একজন নারী লেখক যখন সমাজে প্রচলিত অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরেছেন, তখন তাকে রক্তাক্ত করে, ঘর পুড়িয়ে, থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি রুবি আক্তারের আকুতি
বর্তমানে রুবি আক্তার ও তার পরিবার গৃহহীন, আত্মগোপনে রয়েছেন। তিনি সরকারের কাছে দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি শুধু প্রশ্ন তুলেছি। আমি চেয়েছি মুক্তচিন্তার জায়গা তৈরি হোক, নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। যদি সেটাই অপরাধ হয়, তাহলে এ দেশে যুক্তির মানুষদের কোনো জায়গা নেই।”
রুবি আক্তারের ওপর বর্বর হামলা, তার পরিবারের ওপর চালানো সহিংসতা, এবং প্রশাসনের নীরবতা—সব মিলে এটি একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজে এখনো মুক্তচিন্তা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং একজন লেখক কত সহজে নিঃস্ব হয়ে যেতে পারেন কেবল সত্য বলার জন্য। প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র কি রুবি আক্তারের পাশে দাঁড়াবে? নাকি যুক্তির কণ্ঠগুলো একে একে নিভে যাবে মৌলবাদের ধমকে?