এই প্রশ্নটা শুনলে বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি তৈরি হয়।
কারণ এটা কোনো তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়। এটা কারও অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন।
ট্রান্সজেন্ডাররা কি এই দেশের নাগরিক নয়?
তারা কি এই মাটিতে জন্মায়নি?
তাদের কি শ্বাস নেওয়ার, বেঁচে থাকার, নিরাপদে চলার অধিকার নেই?
ট্রান্সজেন্ডার হওয়া কোনো অপরাধ নয়। এটা কোনো বিকৃতি নয়। এটা কোনো ষড়যন্ত্রও নয়। এটা মানুষের লিঙ্গ পরিচয়ের একটি স্বাভাবিক বৈচিত্র্য। পৃথিবীর সব সমাজেই, সব সংস্কৃতিতেই ট্রান্সজেন্ডার মানুষ ছিল, আছে, থাকবে।
তবুও প্রশ্ন ওঠে—
“তারা কি দেশে থাকতে পারবে?”
“তাদের অধিকার থাকা কি ঠিক?”
এই প্রশ্নগুলো আসলে ভয় থেকে আসে।
ভিন্নতাকে ভয় পাওয়ার সংস্কৃতি থেকে আসে।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে “স্বাভাবিক” শব্দটার সংজ্ঞা খুব সংকীর্ণ। যে এই গণ্ডির বাইরে যায়, তাকেই বলা হয় সমস্যা, বোঝা, লজ্জা, বা হুমকি। ট্রান্সজেন্ডার মানুষরা এই সংকীর্ণতার প্রথম শিকারদের একজন।
তাদের স্কুলে ঢুকতে দেওয়া হয় না।
চাকরি দেওয়া হয় না।
বাসা ভাড়া দেওয়া হয় না।
রাস্তায় বের হলে অপমান, হেনস্তা, সহিংসতা নিত্যদিনের ঘটনা।
তারপর বলা হয়—
“ওরা কেন ভিক্ষা করে?”
“ওরা কেন সমাজে মিশে না?”
অথচ সমাজই তো তাদের সব দরজা বন্ধ করে রেখেছে।
অধিকার মানে বিশেষ সুবিধা নয়।
অধিকার মানে ন্যূনতম মানবিক নিরাপত্তা।
ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার মানে—
নিরাপদে বাঁচার অধিকার
শিক্ষা নেওয়ার অধিকার
সম্মানের সঙ্গে কাজ করার অধিকার
চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার
পরিচয়পত্রে নিজের পরিচয় স্বীকৃত হওয়ার অধিকার
সহিংসতা ও ঘৃণা থেকে সুরক্ষার অধিকার
এর কোনটা অতিরিক্ত দাবি?
ধর্ম, সংস্কৃতি বা সামাজিক মূল্যবোধের নামে যখন বলা হয়—
“ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার নেই”,
তখন আসলে বলা হয়—
“তাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হবে না।”
এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা।
কারণ একবার যদি আমরা ঠিক করে ফেলি, কে মানুষ আর কে নয়—
তাহলে সেই তালিকা কখনো ছোট থাকে না।
আজ ট্রান্সজেন্ডার।
কাল সমকামী।
পরশু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী।
তারপর ভিন্ন মতের মানুষ।
এইভাবে ধীরে ধীরে একটি দেশ মানুষের জন্য নয়, ভয় ও নীরবতার জন্য তৈরি হয়।
ট্রান্সজেন্ডাররা এই দেশের বোঝা নয়।
বোঝা হলো আমাদের অমানবিকতা।
প্রশ্নটা তাই হওয়া উচিত নয়—
“ট্রান্সজেন্ডাররা কি দেশে থাকতে পারবে?”
সঠিক প্রশ্ন হলো—
“আমরা কি এমন একটা দেশ চাই, যেখানে কিছু মানুষ শুধু জন্মের কারণেই নিরাপদ থাকবে না?”
এই প্রশ্নের উত্তরই আসলে আমাদের মানবিকতার মাপকাঠি।