এই প্রশ্নটা শুনলেই একটু থমকে যেতে হয়।
কারণ প্রশ্নটার ভেতরেই একটা ভয়ংকর ধারণা লুকিয়ে আছে—
যেন কিছু মানুষের অধিকার থাকা স্বাভাবিক, আর কিছু মানুষের অধিকার থাকা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে।
সমকামীরা কি মানুষ নয়?
তারা কি এই সমাজে জন্মায় না, বাঁচে না, কষ্ট পায় না?
মানুষ হিসেবে জন্মালে অধিকারও জন্মগত। অধিকার কারও দয়ার দান নয়, কোনো ধর্মীয় সার্টিফিকেটের ফলও নয়। অধিকার মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত।
তাহলে সমকামীদের অধিকার নিয়ে এত আপত্তি কেন?
কারণ আমাদের সমাজে যৌন পরিচয়কে নৈতিকতার মাপকাঠি বানানো হয়েছে। কে কাকে ভালোবাসবে, সেটা ঠিক করে দিতে চায় পরিবার, সমাজ, ধর্মীয় নেতা, এমনকি রাষ্ট্রও। অথচ ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়। কারও সঙ্গে সম্মতির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়া কোনো অপরাধ হতে পারে না।
সমকামীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শোনা যায়, তা হলো—
“এটা আমাদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে”,
“এটা ধর্মবিরোধী”,
“এরা সমাজ নষ্ট করে”।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কার সংস্কৃতি?
কোন সমাজ?
এই সমাজেই তো যুগে যুগে মানুষ ভিন্ন মত দিয়েছে, ভিন্নভাবে বেঁচেছে। কেউ কবি হয়েছে, কেউ নাস্তিক হয়েছে, কেউ ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করেছে। সব ভিন্নতাই এক সময় “সমাজ ধ্বংসকারী” বলা হয়েছে। পরে সময়ই প্রমাণ করেছে—ভয়টা ছিল অমূলক।
সমকামীদের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই।
তারা কারও অধিকার কেড়ে নেয় না। তারা কারও ক্ষতি করে না। তারা শুধু চায়—নিরাপদে বাঁচতে, পড়াশোনা করতে, কাজ করতে, ভালোবাসতে। এর কোনটা অমানবিক?
আসলে সমস্যাটা সমকামিতায় নয়।
সমস্যাটা আমাদের সহ্যশক্তিতে।
যখন কেউ আমাদের মতো নয়, তখনই আমরা তাকে ভয় পাই। ভয় থেকে আসে ঘৃণা, আর ঘৃণা থেকে আসে সহিংসতা। তারপর সেই সহিংসতাকে正当তা দিতে ধর্ম, সংস্কৃতি আর নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু কোনো ধর্মই মানুষ হত্যা শেখায় না।
কোনো নৈতিকতাই মানুষকে মানুষ হিসেবে অস্বীকার করতে শেখায় না।
সমকামীদের অধিকার মানে বিশেষ কোনো অধিকার নয়।
এটা শুধু সমান অধিকার।
বেঁচে থাকার অধিকার।
ভয় ছাড়া বাঁচার অধিকার।
অপমান ছাড়া বাঁচার অধিকার।
আজ যদি আমরা বলি, “সমকামীদের অধিকার নেই”,
তাহলে কাল বলা হবে—ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার নেই,
পরশু বলা হবে—ভিন্ন মতের মানুষের অধিকার নেই।
এইভাবে একদিন অধিকার থাকবে শুধু শক্তিশালীদের জন্য।
তাই প্রশ্নটা নতুন করে ভাবা দরকার।
সমকামীদের কি অধিকার থাকার কথা নয়?
না।
সঠিক প্রশ্ন হলো—
আমরা কি এখনো মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখিনি?