সিলেট: উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন লেখক, সংস্কৃতিকর্মী এবং মুক্তচিন্তার ধারক ইমরানা বেগম। গত কয়েক মাসে তার ওপর দফায় দফায় সশস্ত্র হামলা, বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সর্বশেষ আইনি হয়রানির মাধ্যমে তাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাপ্রবাহ
ইমরানা বেগম সিলেটের একজন পরিচিত সংস্কৃতিকর্মী, যিনি ‘সুরের পাঠশালা’ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। তার পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি এবং তার মুক্তচিন্তার লেখালেখি দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিশেষ মৌলবাদী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, ইমরানা বেগম তার লেখনী ও কাজের মাধ্যমে সমকামী এবং হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের (থার্ড জেন্ডার) জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা এবং অন্তর্ভুক্তির পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখে আসছেন। প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী নিয়ে তার সরব অবস্থান ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের আদর্শের পরিপন্থী বলে গণ্য করে। গত ২০ জুন ২০২৫ তারিখে শিক্ষার্থী টুম্পা চক্রবর্তীর ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করার পর থেকে তার ওপর চাপ প্রয়োগ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে, সেপ্টেম্বর মাসে তার বাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং তার নাচের স্কুলটি সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ধারালো অস্ত্র নিয়ে সশস্ত্র হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং দীর্ঘ ১৯ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, থানায় একাধিকবার সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং অভিযোগ দায়ের করা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো হামলাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তাকে ও তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ইমরানা বেগম অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা ধর্মীয় স্লোগান ব্যবহার করে তাকে আক্রমণ করেছে, যা প্রমাণ করে যে সমাজ ও রাষ্ট্রে মৌলবাদী শক্তি কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
মিথ্যা মামলার বেড়াজাল
শারীরিক হামলায় দমাতে না পেরে এবার আইনি পথে তাকে হেনস্তা করার কৌশল নিয়েছে মৌলবাদী গোষ্ঠী। গত ১৭ অক্টোবর আরিফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ইমরানা বেগম এবং তার বইয়ের প্রকাশক লাসিন আরাফাতের বিরুদ্ধে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’-এর অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। লেখক ও অধিকারকর্মীদের মতে, এটি কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ করার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে ইমরানা বেগম বলেন, “আমার বসতবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে, আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকে রক্তাক্ত করা হয়েছে, এখন মামলার ভয় দেখিয়ে আমাকে ঘরছাড়া করার চেষ্টা চলছে। আমি মৃত্যুর ভয়ে কলম থামাব না। সমকামী এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমার কলম চলবেই। এসব অধিকারের কথা বলা যদি অপরাধ হয়, তবে আমি সেই অপরাধ গর্বের সাথে চালিয়ে যাব।”
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে ইমরানা বেগমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে, তথাকথিত ‘ধর্মীয় অনুভূতি’র দোহাই দিয়ে মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর এ ধরনের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বর্তমানে লেখক ইমরানা বেগম আত্মগোপনে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দাবি—বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে বাংলাদেশ খুব দ্রুত একটি অশুভ অন্ধকার যুগের দিকে ধাবিত হবে।