বাংলা শিশুসাহিত্যে এমন কিছু স্রষ্টা আছেন, যাঁদের সৃষ্টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। পাঠশালার চৌকাঠ পেরোনোর আগেই যেসব ছড়া শিশুর মনে আনন্দের দোলা দেয়, তার মধ্যে অন্যতম ‘কানা বগীর ছা’। ‘ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ’—এই চিরচেনা পঙ্ক্তি শোনেননি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। ছড়াটির রচয়িতা ছড়াসম্রাট ও একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন। বাংলা শিশুসাহিত্যের বিকাশে তাঁর অবদান অনন্য ও অবিস্মরণীয়। সহজ ভাষা, সাবলীল ছন্দ এবং লোকজ জীবনবোধের অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি শিশুদের জন্য নির্মাণ করেছিলেন এক স্বতন্ত্র সাহিত্যভুবন।
১৯০১ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার চারিগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন। তাঁর শৈশব ছিল নানা প্রতিকূলতা ও সংগ্রামে ভরা। অল্প বয়সেই তিনি পিতা-মাতাকে হারান। উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবারের জন্য কোনো ভূসম্পত্তি কিংবা আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। ফলে শৈশবেই তাঁকে জীবিকার সন্ধানে সংগ্রামে নামতে হয়।
ভাগ্যান্বেষণে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। সেখানে একটি বই বাঁধাইয়ের প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁর শিক্ষার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। দিনের কর্মব্যস্ততার পর রাতে নৈশবিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর কলকাতা করপোরেশনের শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতা করপোরেশন পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘ বিশ বছর শিক্ষকতা করেন।
দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা তাঁর জীবনবোধ পরবর্তী সময়ে সাহিত্যচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শিশুদের মনোজগৎ, তাদের আনন্দ-বেদনা, কল্পনা ও স্বপ্নকে তিনি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করার সুযোগ পান শিক্ষকতার সুবাদে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৩ সালে তিনি সাপ্তাহিক ‘মুসলিম জগত’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পত্রিকায় ‘বিদ্রোহ’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশের কারণে তাঁকে ছয় মাস কারাভোগ করতে হয়। কারাবাসের সময় হুগলি জেলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। পরবর্তী সময়ে নজরুলের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা এবং স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রচনায় এই পরিচয়ের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলহামরা লাইব্রেরি’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা। এখান থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের উপযোগী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শিশুদের বয়স, বোধশক্তি ও মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় রেখে সহজবোধ্য সাহিত্য রচনার প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের জন্য ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও জীবনী রচনায় তিনি নিজেকে নিবেদিত রাখেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে শিশুমনের সরলতা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, নৈতিক শিক্ষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে।
বাংলা শিশুসাহিত্যে খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর ছড়াকারসত্তা। ‘কানা বগীর ছা’ ছড়াটি তাঁকে এমন এক জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে, যা সময়ের পরিবর্তনেও ম্লান হয়নি। ছড়াটির কয়েকটি পঙ্ক্তি যেন বাঙালির শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ
‘ঐ দেখা যায় তালগাছ,
ঐ আমাদের গাঁ,
ঐ খানেতে বাস করে
কানা বগীর ছা।’
কয়েকটি সাধারণ শব্দের মধ্য দিয়ে তিনি গ্রামীণ বাংলার এক চিরচেনা ছবি এঁকেছেন। তালগাছ, গ্রামের পরিবেশ, বক এবং তার ছানাকে ঘিরে তৈরি করেছেন শিশুমনের উপযোগী এক আনন্দময় কল্পজগৎ। ছড়াটির ছন্দ, শব্দের মাধুর্য ও কথোপকথনের ভঙ্গি শিশুদের সহজেই আকৃষ্ট করে। এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে বাংলার প্রকৃতি ও লোকজ জীবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য।
তাঁর ছড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সরলতা। তিনি শিশুদের জন্য লিখেছেন শিশুদেরই ভাষায়। জটিল শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য বাক্যের পরিবর্তে পরিচিত পরিবেশ, চেনা মানুষ, পশুপাখি ও প্রকৃতির অনুষঙ্গকে সাহিত্যের উপাদান করেছেন। ফলে তাঁর রচনা শিশুদের কাছে কেবল পাঠ্য নয়, আনন্দ ও কল্পনার সঙ্গী হয়ে উঠেছে।
শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আমাদের নবী’ (১৯৪১), ‘খোলাফা-ই-রাশেদীন’ (১৯৫১), ‘আরব্য রজনী’ (১৯৫৭), ‘বাবা আদম’ (১৯৫৭), ‘স্বপন দেখি’ (১৯৫৯), ‘লাল মোরগ’ (১৯৬১) এবং ‘শাপলা শালুক’ (১৯৬২)।
শিশুতোষ সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি কবিতা, গল্প ও উপন্যাস রচনাতেও পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পালের নাও’, ‘হে মানুষ’ ও ‘আর্তনাদ’। উপন্যাসের মধ্যে ‘অনাথিনী’ ও ‘নয়া সড়ক’ উল্লেখযোগ্য। ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে ‘ঝুমকোলতা’।
তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জীবনী রচনা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে তিনি রচনা করেন ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ (১৯৫৭)। গ্রন্থটি তাঁর সাহিত্যজীবনে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
শিশুসাহিত্যে দীর্ঘদিনের সাধনা এবং অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন জীবদ্দশায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন।
১৯৬০ সালে তিনি শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ গ্রন্থের জন্য ইউনেস্কো পুরস্কারে ভূষিত হন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৮ সালে তিনি লাভ করেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক।
এই অর্জনগুলো কেবল একজন লেখকের ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়; বরং বাংলা শিশুসাহিত্যের মর্যাদা ও বিকাশের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
১৯৮১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলা শিশুসাহিত্যের এই কৃতী পুরুষ মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মানুষের জীবন থেকে তাঁর প্রস্থান ঘটলেও তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু ঘটেনি। ‘কানা বগীর ছা’র মতো কালজয়ী ছড়া আজও শিশুদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ছড়ার মধ্য দিয়ে পরিচিত হচ্ছে বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতি, লোকজ জীবন ও ছন্দময় শব্দের জাদুর সঙ্গে।
বর্তমান সময়ে শিশুদের পাঠাভ্যাস যখন নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের মতো স্রষ্টাদের সাহিত্যকর্ম নতুন করে পাঠ ও চর্চার দাবি রাখে। কারণ শিশুসাহিত্য কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়; এটি শিশুর কল্পনাশক্তি, ভাষাবোধ, নৈতিকতা ও মনন বিকাশের অন্যতম মাধ্যম।
খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন বুঝেছিলেন, শিশুদের কাছে পৌঁছাতে হলে তাদের মনের ভাষায় কথা বলতে হয়। তাই তিনি বড়দের জটিল সাহিত্যভুবন থেকে বেরিয়ে শিশুদের জন্য নির্মাণ করেছিলেন আনন্দ, কল্পনা ও শিক্ষার এক স্বতন্ত্র জগৎ। তাঁর সাহিত্যকীর্তি প্রমাণ করে, শিশুর জন্য লেখা মানে ছোট করে লেখা নয়; বরং শিশুর মনকে বুঝে গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করা।
বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন তাই শুধু একজন ছড়াকার নন, তিনি শৈশবের এক চিরচেনা কণ্ঠস্বর। যত দিন বাংলা ভাষা থাকবে, যত দিন শিশুরা ছন্দে ছন্দে প্রকৃতিকে চিনবে, তত দিন তাঁর সৃষ্টির আবেদন অমলিন হয়ে থাকবে।