বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল মুক্তচিন্তা, মানবাধিকারের এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেতনাকে ধারণ করে। স্বাধীনতার এই মূলমন্ত্র আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ। কিন্তু আজ, স্বাধীনতার এই চেতনা যে বিপদে পড়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। নাস্তিক, ব্লগার, লেখক এবং মুক্তচিন্তকরা একের পর এক হত্যার শিকার হচ্ছেন—শুধু তাদের ভিন্নমত প্রকাশ করার কারণে।
২০১৩–২০১৬ সালের মধ্যে অন্তত ২০–২৫ জন ব্লগার ও মুক্তচিন্তককে হত্যা করা হয়েছে। কেউ কেউ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি, অনেক হত্যাকারী বিচার পাননি। এর মধ্যে এ ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ড নয়; এটি পুরো সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের ওপর আঘাত। একজন লেখক, ব্লগার বা প্রকাশক যখন হত্যা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি লিখতে পারব? আমরা কি বলতে পারব? যে সমাজে ভিন্নমতকে হত্যা করা হয়, সেখানে বাকিরাও চুপ হয়ে যায়, ভয়ে ঘরবন্দি হয়।
ধর্ম এই সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি আমাদের সংস্কৃতি, সামাজিক জীবন এবং ব্যক্তিগত চিন্তাকে আকার দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ধর্ম কি মানুষের জীবন, মত প্রকাশ এবং স্বাধীন চিন্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়? নাস্তিকদের ওপর হামলা ধর্মের মুখোশে ঢেকে রাখা বর্বরতা। ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা শেখায়—সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা, মানবিক মর্যাদা রক্ষা। যে গোষ্ঠী ভিন্নমতকে হত্যা করছে, তারা প্রকৃত ধর্মের শিক্ষা থেকে একদমই বিচ্যুত। তারা সমাজকে ভয়ে ঘিরে রাখে, মানুষের চিন্তাকে দমন করে।
বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে, যারা প্রশ্ন করেছে, যারা ভিন্নমত নিয়ে লিখেছে, তারা সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে। চার্বাক, লোকায়ত এবং অন্যান্য প্রগতিশীল চিন্তকরা আমাদের শিখিয়েছেন—“চিন্তা করতে শিখো, প্রশ্ন করতে শিখো।” আজকের বাংলাদেশে নাস্তিকদের ওপর সহিংসতা সেই ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা। এটি শুধু একজন মানুষের ক্ষতি নয়, এটি স্বাধীন চিন্তার সংস্কৃতির ওপর আঘাত।
শিক্ষাব্যবস্থার দিক থেকেও এটি বিপজ্জনক। শিক্ষা মানে প্রশ্ন করা, যুক্তি খোঁজা, নতুন জ্ঞান অর্জন করা। নাস্তিকদের ওপর সহিংসতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ছড়াচ্ছে। শিক্ষকরা নতুন চিন্তা প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন, ছাত্ররা প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছে। এর ফলে দেশের সৃজনশীলতা ও গবেষণা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা চাই বাংলাদেশকে এমন একটি দেশ হিসেবে, যেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ভয় ছাড়া লিখতে ও প্রশ্ন করতে পারে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও প্রশ্নবিদ্ধ। যেখানে নাস্তিকরা হত্যা হচ্ছে, সেখানে রাষ্ট্র কোথায়? বিচার বিলম্বিত হচ্ছে, হত্যাকারীরা শাস্তি পাচ্ছে না। এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের ব্যর্থতা। উগ্রবাদীরা এই সুযোগ নিয়ে শক্তিশালী হচ্ছে, সমাজের ভিন্নমত ধ্বংস হচ্ছে। রাষ্ট্রকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে—নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে।
নাগরিক সমাজের নীরবতা উগ্রবাদীদের শক্তি বাড়ায়। যদি আমরা চুপ থাকি, ভয়ই জয়ী হবে। প্রতিবাদ করা আমাদের দায়িত্ব। সচেতনতা তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা বলি—মুক্তচিন্তা রক্ষা করতে হবে। যারা ভিন্নমতকে হত্যা করছে, তারা আমাদের সংস্কৃতির শত্রু। আমাদের কথা উচ্চ, সাহসী এবং প্রতিবাদী হতে হবে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বিপদ দেখা দিয়েছে। একজন লেখকের কলম নীরব হলে সমাজের আলোও নীরব হয়। নাস্তিক লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকরা যে কারণে হত্যা করা হয়েছে—সেটি শুধু তাদের জীবনের ক্ষতি নয়, এটি আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশকে হত্যা করেছে। আমরা চাই বাংলাদেশকে এমন একটি সমাজ হিসেবে, যেখানে সাহিত্যিক এবং গবেষক ভয় ছাড়া লিখতে পারে। যেখানে সংস্কৃতি, সাহিত্য ও মুক্তচিন্তা উজ্জ্বল আলো হিসেবে বিকশিত হতে পারে।
এই সহিংসতা আন্তর্জাতিকভাবে নজরে আসে। এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে। বিশ্বমিডিয়া, মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গবেষকরা এই ঘটনার ওপর নজর রাখছে। মুক্তচিন্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে দেশের মর্যাদা রক্ষা করা। ভিন্নমত হত্যা করলে শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নাস্তিকদের হত্যা মানে সমাজের নৈতিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। সহানুভূতি, সহিষ্ণুতা এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। কোনো বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের কারণে মানুষকে হত্যা করা চলবে না। যে সমাজে মানুষের জীবন, মত প্রকাশ ও স্বাধীনতা নিরাপদ নয়, সেখানে সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।