মূল সংবাদে যান

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

কমিউনিটি ক্লিনিক যেন ক্লিনিক্যালি ডেড!

দেশের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গড়ে উঠেছে কমিউনিটি ক্লিনিক। উদ্যোগটি শুরুর পর থেকে একদিকে যেমন প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ভূমিকা রেখেছে; তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে হয়েছে প্রশংসিত, পেয়েছে স্বীকৃতি। কিন্তু প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার ক্লিনিকের বেশিরভাগই জর্জরিত নানা সংকটে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, জনবল সংকট কিংবা ওষুধ সরবরাহে অনিয়ম-ঘাটতির কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোই এখন ‘ক্লিনিক্যািল ডেড’ হওয়ার পথে।

সারা দেশে বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে ১৪ হাজার ৪৭৫টি। সরকারি হিসাবে এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ নেন হাজার পঞ্চাশেক মানুষ। কিন্তু বিপুলসংখ্যক এই অবকাঠামোর প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে সংস্কার বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন। এসব ভবনের মধ্যে ৫ হাজারের বেশি ভবনের কোনোটিতে ছাদের রড বের হয়ে গেছে। কোনোটির খসে গেছে পলেস্তারা। ঝরে পড়ছে সিমেন্ট-বালু। কোনোটির আবার জানালা ভাঙা, বৃষ্টির পানি ঢুকছে। কোথাও আবার ফ্যান নষ্ট। কোথাও দেয়ালে ফাটল। কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক আবার পড়ে রয়েছে পুরোপুরি পরিত্যক্ত অবস্থায়। খুলনার কয়রা সদর ইউনিয়নের উত্তর মদিনাবাদ কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থাও এমন। ছাদ ও দেয়ালে ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা। ভেতরে জমেছে আবর্জনা। ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় এক বছর ধরে পাশের একটি বাড়ির বারান্দায় বসে রোগী দেখছেন সিএইচসিপি প্রকৃতি গাইন। নষ্ট বিপি মেশিনের কারণে সেখানেও রক্তচাপ মাপা সম্ভব হয় না। ওষুধ সংরক্ষণেও সমস্যায় পড়তে হয় তাকে।

ভবনের এসব সমস্যার বিষয়ে অবগত কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুজ্জোহা। তিনি বলেছেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের অনেক ভবনই জরাজীর্ণ, এ ভবনগুলো তালিকাভুক্ত করা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে কমবেশি ৬ হাজার ভবন পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করা হবে। আর যেসব ভবন একদম ব্যবহার উপযোগী নয়, সেখানে অস্থায়ী ব্যবস্থায় অন্যত্র ক্লিনিকের কার্যক্রম চলছে।

ভবনগুলোর বেহালদশা নিয়ে আলোচনা গড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। গত জুনে সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় জমিপ্রাপ্তি এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দসাপেক্ষে আরও ৫৪০টি নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ১৯৯৮-২০০২ সালের মধ্যে। সেই হিসাবে এগুলোর সর্বোচ্চ বয়স ২৪-২৮ বছর। কিন্তু এর মধ্যেই ভবনগুলো ‘ব্যবহার অনুপযোগী’ হয়ে পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণকালের অনিয়ম নিয়েও।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেছেন, ‘ভবন নির্মাণের বিধিবিধান মেনে চললে কমপক্ষে ৫০ বছর এগুলো ব্যবহার উপযোগী থাকার কথা। এত দ্রুত ভবনগুলো পরিত্যক্ত হওয়ার কথা নয়। তবে ভবন তৈরির সময় উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণ করা না হলে এবং পরে ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণ না হলে খারাপ হবে, ভেঙে যাবে, দেবে যাবে।’

নির্মাণকাজ ১৯৯৮ সালে শুরু হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম চালু করা হয় ২০০০ সালের ২৬ এপ্রিল। ক্লিনিকগুলো প্রথমদিকে কমিউনিটি-বেজড হেলথকেয়ার (সিবিএইচসি) কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ২০১৮ সালে এর কার্যক্রমকে টেকসই করতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্ট আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে।

কাগজ-কলমে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিক খোলা থাকার কথা। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক সকাল ১০টার পর খুলে বন্ধ হয়ে যায় দুপুর ১২টার আগেই। কোনোটি আবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম চলে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা। এ ছাড়া সপ্তাহে ছয় দিন খোলা থাকার কথা থাকলেও অনেক কমিউনিটি ক্লিনিক দু-তিন দিনের বেশি খোলে না।

সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌর শহরের একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম চলে মাত্র দু-তিন ঘণ্টা। সপ্তাহে দু-তিন দিন। এতে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই ক্লিনিকের পাশের বাসিন্দা বিলকিছ বেগমের অভিযোগ, ‘ডাক্তার নিয়মিত ক্লিনিকে আসেন না। বেলা ১১টায় এলেও দুপুর ১টার আগে চলে যান।’

অবশ্য এ অবস্থা কাটাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানালেন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুজ্জোহা। তিনি বলেছেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবাদাতাদের উপস্থিতি ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে আকস্মিক পরিদর্শন করছি। বেশিরভাগ জায়গাতেই পরিস্থিতি সন্তোষজনক। কোথাও অনিয়ম পেলে বেতন কর্তন, বন্ধ ও সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।’

কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবাদাতাদের উপস্থিতির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যার তুলনায় লোকবলই অনেক কম। ১৪ হাজার ৪৭৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকের বিপরীতে বর্তমানে জনবল রয়েছে ১৩ হাজার ৮৭৮ জন। এর মধ্যে আবার অনিয়মের অভিযোগে ৪০ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন করে কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডারের সপ্তাহে ছয় দিন সেবা দেওয়ার কথা। এ ছাড়া একজন স্বাস্থ্যসহকারী ও একজন পরিবারকল্যাণ সহকারীর সপ্তাহে দুদিন করে সেবা দেওয়ার কথা।

কমিউনিটি ক্লিনিকের বিপরীতে কম জনবল নিয়ে কীভাবে চলতে পারে— জানতে চাইলে ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, ‘২০২৪ সালের পর আর ট্রাস্টের সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে নতুন করে জনবল নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।’

প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জন সেবা নেন। সেবাগ্রহীতার ৮০ শতাংশ নারী ও শিশু। কমিউনিটি ক্লিনিকে ২২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ আছে, যা বিনামূল্যে রোগীদের দেওয়া হয়। তবে রোগীদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ— ক্লিনিকগুলো থেকে দু-তিন পদের বেশি ওষুধ মেলে না, যা দরিদ্র রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। বেশিরভাগ সময় উত্তর থাকে, ‘ওষুধের সাপ্লাই নেই।’

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাসিন্দা সানোয়ার খাঁ বলেছেন, ‘ওষুধ নিতে এসেছি; কিন্তু পাচ্ছি না। যারা এই ক্লিনিকের দায়িত্বে আছেন, তারা বলেছেন ওষুধ নেই। এখান থেকে ভালো ধরনের সেবা পেতাম, এখন পাচ্ছি না।’

তবে ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভাষ্য, ‘ওষুধের এখন পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। পরিদর্শনের সময় দেখেছি কয়েক ধরনের ওষুধের চাহিদা বেশি। সে বিষয়টি আমরা আমলে নিয়ে কাজ করছি।’

তিনি জানালেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতন সহায়তা বাবদ ৪৪০ কোটি ও পণ্যসহায়তার জন্য ২২০ কোটি, অর্থাৎ মোট ৬৬০ কোটি টাকার বাজেট রয়েছে।

এদিকে, দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে ঢেলে সাজাতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বলেছেন, গ্রামাঞ্চলে প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে হেলথকেয়ার ইউনিট থাকবে। এই হেলথকেয়ার ইউনিটের অধীনে তিনটি করে কমিউনিটি হাব থাকবে। এখন যে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে, সেগুলো কমিউনিটি হাবে রূপান্তর করা হবে। তখন কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করা যাবে।

সূত্র: আগামীর সময়