মূল সংবাদে যান

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

গ্রিক সভ্যতার আলো-অন্ধকার
হোমার
কালজয়ী এক সৃজনশীল মানুষের নাম হোমার। হাজার হাজার বছর পরেও যার সৃষ্টি এখনও অম্লান রয়ে গেছে এবং তার জীবন নিয়ে মানুষের কৌতুহলে ভাটা পড়েনি এখনও। হোমারের জন্ম সাল নিয়ে অনেক কথা আছে পৃথিবীর ইতিহাসে। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য হলো ইতিহাসবিদ হিরোডোটাসের মতে হোমার ছিলেন তার থেকে ৪০০ বছরের অগ্রজ। এ তথ্যকে সামনে রেখে গবেষকদের মতে হোমারের আভির্ভাব হলো ৮৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। হোমারের জীবন নিয়ে যতটা জানা যায় তা অনেকটা কিংবদন্তীর মত। হোমারের সঠিক জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক আছে। গ্রীসের সাতটি নগরীকে হোমারের জন্মস্থান নিয়ে দাবী করা হয়। এই সাতটি জায়গা হলো–স্মর্না, ইথাকা, সাইপ্রাস, আর্গস, এথেন, কিয়স ও কলোফিন। হোমারের পিতা ছিলেন একজন চারণ কবি। পিতার পদাংক অনুসরণে হোমারও হয়ে উঠেছিলেন জগত কাঁপানো এক চারণ কবি। চারণ কবিরা মুখে মুখে যা আবৃত্তি করতেন তা একসময় ছড়িয়ে পড়তো জনসাধারণের মধ্যে।
পৃথিবীর ইতিহাসে যতটা মহাকাব্য এখনও সগৌরবে টিকে আছে তার মধ্যে হোমারের ইলিয়ড-অডিসি উল্লেখযোগ্য। হোমার জন্মান্ধ ছিলেন একথা কেউ কেউ বলেন, তবে একথা মেনে নিলে তিনি যে নিরক্ষর ছিলেন এটা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। তাহলে ইলিয়াড-অডিসির মত এত বিশাল মহাকাব্য তিনি কাগজে কলমে লিখেননি, তিনি বলেছেন আর অন্যরা এর লেখ্যরুপ দিয়েছেন। এবিষয়ে বিখ্যাত মার্কিন সমালোচক মিলান পারী( ১৯০২–৩৫) এর মন্তব্য হলো–“The Iliad and the Odyssey were actually a special type of poetry composed orally. There was no practice of writing here. And Homer was one of the best singing poets of that time. He used to sing the composed verses in his own beautiful voice. অর্থাৎ ” ইলিয়াড ও অডিসি ছিলো আসলে মুখে মুখে রচিত এক বিশেষ ধরনের পদ্য। এখানে লেখার কোন প্রচলন ছিলো না। আর হোমার ছিলেন সে কালের একজন শ্রেষ্ট গায়ক কবি। তিনিই স্বরচিত পদ্যগুলো নিজের সুললিত কণ্ঠে গেয়ে বেড়াতেন”। হোমার অন্ধ ছিলেন একথা অবশ্যই রুপকার্থে গ্রহণ করতে হবে বলে কোন কোন গবেষক বলেন। আর এটাই সত্য যে হোমার জন্মান্ধ ছিলেন না। ইতিহাসবিদ হিরোডোটাসের মতে হোমার শেষ বয়সে পৌঁছে দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।
হোমার ছিলেন এক ভাগ্যবান কবি। যে কোন ধর্মীয় উৎসবে হোমারের কবিতা আবৃত্তি করার রেওয়াজ ছিলো। ইলিয়াডের পরে অডিসি রচিত হলেও কাব্যগুণে অডিসি ইলিয়াডকে অতিক্রম করতে পারেনি বলে অনেকে বলেন। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো কবিদেরকে অপছন্দ করতেন বলে তার কাছে হোমার রচিত ইলিয়াড-অডিসির কোন গুরুত্ব ছিলোনা। প্লেটো তার Republic গ্রন্থের এক জায়গায় লিখেছেন–” we may conclude then, that all poetry from Homer onwards consists in representing a semblance of its subject whatever it may be, including any kind of human excellence with no grasp of the realities.”
হোমার সম্পর্কে প্লেটোর ছাত্র এরিস্টটলের মন্তব্য হলো–” হোমারই মুলতঃ অন্যান্য কবিদেরকে দক্ষতার সাথে মিথ্যা বলার শিল্প শিখিয়েছেন”। এরিস্টটলের বক্তব্যকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যাবেনা। কারণ বেশীর ভাগ কবিই কমবেশী হোমার দ্বারা প্রভাবিত।
হোমারের অমর সৃষ্টি শিল্প-সাহিত্য ও সংষ্কৃতিতে এখনও আলোকবর্তিতা হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ধ্রুপদী গ্রীক সাহিত্যের নির্যাস পেতে চাইলে হোমারের হাত ধরেই এগিয়ে যেতে হবে। হোমার এমন এক কবি যার পরবর্তী কবিরা তার বলয়ের ভেতরে থেকেই তাদের কলম সাধনাকে এগিয়ে নিয়েছেন। আমরা জানি কবি ভার্জিলের বিখ্যাত মহাকাব্য ‘দ্য ইনিয়াড’ এবং মহাকবি দান্তের ‘ডিভাইন কমিডি’ তেও হোমারের সুষ্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্যনীয়। আরও কবির নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন যারা ছিলেন হোমার দ্বারা প্রভাবিত। তাদের মধ্যে আর্চিলোকাস, অলকম্যান, টাইয়ারটাউস, ক্যালিনাস উল্লেখযোগ্য। একথা নির্দ্বধায় বলা যায় যে শুধু গ্রীক সাহিত্যে নয়, সারা পৃথিবীর সাহিত্য-সংষ্কৃতিতে হোমার এক প্রেরণার নাম।
ট্রয় যুদ্ধের কথা এখন আর কারো অজানা নয়। এই যুদ্ধের চিত্র এমন ভাবে চিত্রিত করেছেন হোমার, যে ছবি আমাদেরকে ৩২৫০ বছর পেছনে নিয়ে যায়। এই যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো হোমারের জন্মের ৪০০ বছর আগে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব ১২৫০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে। ট্রয় যুদ্ধের নেপথ্য কারণ ছিলো হেলেন নামের এক অনুপম সুন্দরী নারী। এ নারীকে অপহরণ করার কারণে গ্রীকরা ট্রয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ এক দশক পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো এবং গ্রীসের সকল মানুষ এই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলো। এই যুদ্ধের ইতিহাস পাওয়া যাবে ইতিহাসবিদ হিরোডোটাসের লেখায়। ইতিহাস কেউ পড়তে চায়না, কিন্তুু হোমারের কলমে জীবন্ত হয়ে ওঠা বিগত দিনের ইতিহাস আদ্যোপান্ত পাঠ করছে জগদ্বাসী। এখানে ব্যক্তি হোমারের কৃতিত্ব নয়, কৃতিত্ব তার শিল্পী সত্বা ও শৈল্পিক উপস্থাপনার।
গ্রীকদের সাথে ট্রোজানদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে ট্রয় যুদ্ধ বলা হয়ে থাকে। অনেকে আবার প্রশ্ন করতে পারেন- -ট্রোজান আবার কারা? এই প্রশ্নের উত্তর হলো–এশিয়া মাইনরের উত্তর-পশ্চিমে ট্রয় নামে একটি রাজ্য ছিল, ট্রয়ের অধিবাসীদেরকে ট্রোজান বলা হত। ট্রোজান ও গ্রীকদের যুদ্ধ হয়েছিলো কেনো? প্রথমে ইলিয়াডের কয়েকটা চরিত্রের সাথে আগে পরিচিত হওয়ার দরকার আছে। আর এই চরিত্র হলো প্রায়াম, প্যারিস, হেক্টর, হেকিউবা, অডিসিউস, চ্যালকাস, অ্যাগমেমনন, হেলেন,মেনালেয়াস, জিউস, পসিডন, অ্যাথিনি, হেফিস্টাস, অ্যাফ্রোদিতি, থেটিস, অ্যাপোলো, অ্যাকিলিস, পাত্রক্লুস, এনিয়া ও ডায়ামিডিস উল্লেখযোগ্য।
ট্রোজানদের রাজার নাম হলো প্রায়াম। প্রায়ামের এক ছেলের নাম প্যারিস, আরেক ছেলের নাম হেক্টর। আর প্রায়ামের স্ত্রীর নাম অর্থাৎ হেক্টর ও প্যারিসের মায়ের নাম হেকিউবা। অপরদিকে গ্রীক সম্রাটের নাম অ্যাগামেমনন। গ্রীকের এক রাজ্যের নাম স্পার্টা। এ রাজ্যের রাজা ছিলেন মেনালেয়াস। আগে উল্লেখ করা হয়েছে ট্রয় যুদ্ধের নেপথ্য কারণ হেলেন নামের এক সুন্দরী নারী। হেলেন কে? তার পরিচয় কী?
হেলেন হলেন স্পার্টার রাজা মেনালেয়াসের স্ত্রী। মেনালেয়াসের আরেক পরিচয় হলো তিনি গ্রীক সম্রাট অ্যাগমেমননের ছোট ভাই। এদিক দিয়ে হেলেন হলেন সম্রাট অ্যাগমেমননের ছোট ভাইেয়ের স্ত্রী। এই হেলেন এমন এক কাজ করলেন যে কাজের কারণে পুরো গ্রীক জাতি লজ্জায় লজ্জাবতী গাছের মত হয়ে গেলো। ঘটনা এরকমঃ ট্রয় রাজপুত্র প্যারিস একবার মেনালেয়াসের সাথে দেখা করতে স্পার্টায় এসেছিলেন। এক পর্যায়ে মেনালেয়াসের সুন্দরী স্ত্রী হেলেনের উপরে তার চোখ পড়ে। আর এভাবে প্যারিস ও হেলেনের মধ্যে এক গভীর সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। তাদের এই প্রেমের আগুন একসময় দাবানলে পরিণত হলে হেলেন স্বামী- সংসার ছেড়ে প্যারিসের সাথে ট্রয়ের দিকে পা বাড়ালেন। স্পার্টার রাজার স্ত্রীর পরকীয়া ও ঘর ছাড়ার বিষয়টা সহজ ভাবে নিতে পারেনি গ্রীক বাসী। ঘটনাটা গ্রীসবাসীর জন্য ছিলো অপমান জনক। তারা প্রচার করলো ট্রয় যুবরাজ প্যারিস রাণী হেলেনকে জোর করে অপহরণ করে নিয়ে গেছেন। আর এই অপপ্রচারের ফলে ট্রোজান ও গ্রীকদের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সুত্রপাত হয়। এই যুদ্ধ ট্রয় যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত হয়ে ইতিহাসের পাতা জুড়ে এখনও রয়ে গেছে।
পৃথিবীতে কত যুদ্ধই সংগঠিত হয়েছে, কিন্তুু সব যুদ্ধের কথা কি মানুষ মনে রেখেছে? কিন্তুু ট্রয় যুদ্ধের কথা এখনও মানুষ মনে রেখেছে, তার কারণ হলো হোমারের ইলিয়াড। এজন্য কবি ভার্জিল বলেছেন– হোমার হলেন কবিদের রাজা। এখন পর্যন্ত ভার্জিলের এই কথা চ্যালেঞ্জ করার মত কোন কবির আবির্ভাব ঘটেনি এই নশ্বর পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে।
থেলিস
থেলিস ছিলেন প্রাচীন বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচাইতে অগ্রসর এক ব্যক্তিত্ব। খ্রীষ্টের জন্মের ৬২৫ বছর আগে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন তুরস্কের বালাতা অঞ্চলে। তুরস্ক তখন গ্রীকের অন্তর্ভূক্ত থাকার কারণে গ্রীক দার্শনিক-বিজ্ঞানীদের তালিকায় থেলিসের নামও আছে। থেলিস ছিলেন সাতজন প্রাচীন বিজ্ঞানীদের একজন। থেলিস সম্পর্কে আমরা যতটা জানি তার বেশীর ভাগ তথ্যই এসেছে এরিস্টটল ও হিরোডোটাসের কাছ থেকে। জগদ্বাসী যখন সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলো, তারা জানতো না চন্দ্র গ্রহণ আসলে কী? অথচ এ সম্পর্কিত জ্ঞান থেলিসের কাছে ছিলো। আবহাওয়া সম্পর্কে তিনি যে পূর্বাবাস দিতেন তা হুবহু ফলে যেত। থেলিস ছিলেন এক অনুসন্ধানী মানুষ। তিনি প্রতিটা ঘটনার পেছনের কারণ খুঁজে বেড়াতেন। এভাবে তিনি কারণের পেছনের কারণ খুঁজার এক পর্যায়ে দেখতে পেলেন ক্রমেই কারণ পদার্থের সংখ্যা অল্পতর হয়ে এসেছে। আর এভাবে তিনি সকল কারণের মুল কারণ খুঁজতে লেগে গিয়েছিলেন।
থেলিসের বাবা এক্সেমায়েস ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, আর মা ক্লেবুলাইন ছিলেন গৃহিনী। বাবার মত থেলিসও ব্যবসার মাধ্যমে জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তুু নিয়তি তাকে গণিত শাস্ত্রের দিকে ঠেলে দিয়েছিলো। তরুণ থেলিস একবার ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে গিয়েছিলেন মিশরে। সেখানে গিয়ে তিনি মিশরীয় পন্ডিতদের কাছে গণিত ও জ্যামিতি বিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এই গণিত ও জ্যামিতি বিদ্যা তাকে ব্যবসার পথে আর অগ্রসর হতে দেয়নি, তিনি বিজ্ঞানচর্চ্চায় মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েন। গ্রীক দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ হিরোডোটাস বলেন—“Thales measured the height of the pyramid by determining the ratio of his own shadow’s length to the pyramid’s shadow’s length at a specific time of day. He also discovered a technique for determining the distance of ships at sea by observing the movement of stars. Additionally, he was the first to show that a year consists of 365 days. He was also aware of solar eclipses, as mentioned earlier. Thales is the originator of some groundbreaking theorems, such as a circle being bisected by any of its diameters, the opposite angles of an isosceles triangle being equal, or the angle subtended by a semicircle being a right angle, etc. These may seem simple, but they are revolutionary. অর্থাৎ “থেলিস দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নিজের ছায়ার দৈর্ঘ্য ও পিরামিডের ছায়ার দৈর্ঘ্যের অনুপাত নির্ণয় করে পিরামিডের উচ্চতা পরিমাপ করেছিলেন। তিনি নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সমুদ্রে অবস্থানরত জাহাজের দূরত্ব নির্ণয় করার কৌশলও আবিষ্কার করেন। এ ছাড়া তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন, ৩৬৫ দিনে এক বছর। তিনি সূর্যগ্রহণ সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। সে ব্যাপারে প্রথমেই বলা হয়েছে। থেলিস কিছু যুগান্তকারী উপপাদ্যের জনক। যেমন একটি বৃত্ত তার যেকোনো ব্যাস দ্বারা সমদ্বিখণ্ডিত হয় বা সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের সমান সমান বাহুগুলোর বিপরীত কোণগুলোও পরস্পর সমান অথবা অর্ধবৃত্তস্থ কোণের পরিমাণ এক সমকোণ ইত্যাদি। এগুলো খুব সরল, কিন্তু যুগান্তকারী।”
থেলিসের মতে–” পানিই হলো সকল বস্তুুর আদি কারণ”। তার এই কথা আজ প্রমানীত। আর আমাদের মতে থেলিসই হলেন সকল বিজ্ঞানীদের আদি কারণ। এই কথার পেছনে অনেক যুক্তি আছে। আমরা ব্যবলনীয় সভ্যতার কথা জানি, জানি মেসোপটিমীয় সভ্যতার কথাও, জানি মিশরীয় সভ্যতার কথাও। থেলিস তার সময়ের মানুষগুলো যখন রুপকথার গল্প বা পৌরানিক কাহিনীর ভেতরে নিজেদের মুক্তি খুঁজে বেড়াতো, তখন তিনি বিজ্ঞানচর্চ্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি ব্যবিলনীয় সভ্যতার আলোকিত মানুষদের লেখা গ্রন্থ পাঠে মনোনিবেশ করেছিলেন, মনোনিবেশ করেছিলেন মিশরীয় সভ্যতার পন্ডিতদের রেখে যাওয়া গ্রন্থে। তার এই অগ্রযাত্রা তাকে এক কালজয়ী চিন্তাবিদে পরিণত করেছিলো। এজন্যই তিনি হতে পেরেছিলেন প্রাচীন গ্রীসের সাতজন গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীদের একজন।
কালজয়ী এই বিজ্ঞানী পরলোক গমন করেছেন ৫৪৮ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে।
ঈশপ
পৃথিবীর সকল শিশুর কাছে জনপ্রিয় লেখক তিনি। শুধু শিশু নয়, পরিণত বয়সের পাঠকদের কাছেও তিনি সমান ভাবে জনপ্রিয়৷ তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যার জীবন ছিলো নানা ঘাত প্রতিঘাতে বর্ণাঢ্য। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন ক্রীতদাস। ক্রীতদাস হলে কী হবে, তিনি সম্মানের পাত্র ছিলেন সবার কাছে। তার আশপাশের লোকজন তাকে খুব ভালবাসতো। তার কারণও আছে, তিনি দেখতে কদাকার-কুৎসিত হলেও তার কাছে মানুষ আসতো গল্প শুনার জন্য। হোমার যেভাবে মুখে মুখে পদ্য বানিয়ে মানুষের কাছে পরিবেশন করতেন, আর আমাদের আলোচিত এই মহান মানুষটি মজার মজার গল্প বানিয়ে মানুষের কাছে পরিবেশন করতেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন কবি হোমারের জন্মের ২৬৪ বছর পরে এবং যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ৬২০ বৎসর আগে। তিনি বেশীদিন ক্রীতদাস হিসেবে থাকেন নি। তিনি মুক্ত হলেন এবং তার জায়গা হলো গ্রীসের লিডিয়া রাজ্যের রাজা ক্রোসাসের রাজ দরবারে। রাজদরবার পর্যন্ত কিভাবে পৌঁছলেন এ কাহিনীও তার জীবনীকাররা উল্লেখ করেছেন। কালজয়ী এই মানুষ আর কেউ নন, তিনি গল্পের রাজা ঈশপ।
ঈশপ ছিলেন এক অলস গৃহস্বামীর ক্রীতদাস। এই লোক সূর্য উঠার আগ পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে থাকতো। তিনি মালিককে প্রতিদিন ডাকতেন ভোরের প্রার্থনায় অংশ গ্রহণ করার জন্য। কিন্তুু মালিক বলতো তুমি প্রার্থনা করো, আমি ঘুমাবো। কিন্তুু ঈশপ ছিলেন নাছোর বান্দা, তিনি প্রতিদিন ভোরে মালিককে ডাকাডাকি করতেন। একদিন ঈশপের গৃহস্বামী বললেন সৃষ্টিকর্তা হলেন দয়ালু, ভোরের প্রার্থনা না করলেও তিনি আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। ঈশপ এ কথা শুনে কোন কথা না বলে চলে গেলেন। এভাবেই চলছিল দিন। একদিন ঈশপের মালিক এক থলি ধানের বীজ ঈশপের হাতে তুলে দিয়ে বললেন তুমি এই বীজগুলো জমিতে বপন করো। ঈশপ মালিকের হাত থেকে বীজ গুলি নিয়ে জমিতে না গিয়ে চলে গেলেন আরেক কৃষকের কাছে। ঐ কৃষকের কাছে ধানের বীজ দিয়ে বললেন এই বীজের পরিবর্তে গমের বীজ দিলে ভাল হয়। ঈশপ গমের বীজ বপন করলেন জমিতে। তারপর দেখার পালা। গমের বীজ থেকে চারা বের হয়ে বাতাসে দুলতে লাগলো। এবার গাছ দেখতে এলেন ঈশপের মালিক। তিনি গমের গাছ দেখে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঈশপের মালিক ঈশপকে গালাগালি শুরু করলেন, আর বললেন তুমি কেনো ধানের বদলে গমের চারা লাগালে। এবার ঈশপ মুখ খুললেন। তিনি বললেন–না তো, আমিতো গমের বীজ বপন করিনি। তখন ঈশপের মালিক বললেন–অসম্ভব, তুমি যা বপন করবে, সেটাই ফল হিসেবে বের হবে। সেই থেকে একটা কথার জন্ম হয়েছে, আর সে কথা হলো–” As sow so you reap.” ঈশপ এতক্ষণ চুপ ছিলেন, এবারে তিনি মালিককে বললেন–আপনার কথাটা সত্য এবং চিরন্তন সত্য বটে। আর এ সত্য সবার বেলায়ও সত্য। আপনি বলেছিলেন ভোরের প্রার্থনা না করেও পরকালে সৃষ্টিকর্তার অনুকম্পায় পার পেয়ে যাবেন। এ কথা যে সত্য নয় তার প্রমান আমি তুলে ধরলাম ধানের বীজের পরিবর্তে গমের বীজ বপন করে। এবারে আমি যে ভোরের প্রার্থনার জন্য আপনাকে ডাকাডাকি করলাম এতদিন এর যৌক্তিকতা অনুধাবন করুন। ঈশপের কথায় তার মালিকের জীবনে পরিবর্তন এসেছিলো। তিনি ঈশপকে আজাদ করে দিয়ে তাকে রাজপরিবার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন।
ঈশপের ভাগ্য বদলে গিয়েছিলো, সারা গ্রীসে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। তিনি একসময় লীডিয়া রাজ্যের মন্ত্রী হওয়ারও গৌরব অর্জন করেন। এত সিঁড়ি মাড়িয়ে উপরে উঠার পরও তিনি গল্প বলা থেকে বিরত থাকেন নি। এই গল্পই তার জন্য কাল হয়ে এসেছিলো।
তার এক গল্প মুখে মুখে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ার কারণে জনগণ ক্ষ্যাপে যায়। উত্তেজিত জনতা তাকে উঁচু পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ফেলে দিয়ে হত্যা করে। আর এভাবে হাজার হাজার বছরের এই কীর্তিমান মানুষের ইহজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
ঈশপ নেই, কিন্তুু তার গল্পগুলো এখনও সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এখনও তার গল্প “ভালুক ও দুই বন্ধু”, “আঙুর ফল টক”, “সিংহ ও ইঁদুর”, “খরগোশ ও কচ্ছপ” মানুষের মুখে মুখে।
পিথাগোরাস
পিথাগোরাসকে দেবতার আসনে বসিয়েছিলো গ্রীসের জনগণ। তার খ্যাতি গ্রীসের গন্ডি পেরিয়ে একদিন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। এখনও গণিত শাস্ত্রের বই হাতে নিয়ে যে নামের সাথে পরিচিত হয় শিক্ষার্থীরা, সে নাম হলোঃ পিথাগোরাস। ছোটবেলা থেকে পিথাগোরাস ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। জ্ঞানার্জনের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ তাকে বিভিন্ন দেশ ভ্রমনে উৎসাহিত করে তোলে। তিনি বিশ্বাস করতেন কোন একজন গুরুর কাছে জ্ঞান সম্পূর্ণ হয়না। জ্ঞানের ভান্ডার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সারা পৃথিবীতে। ডুবুরীর মত ডুব দিয়ে লুকিয়ে থাকা রত্নকে খুঁজে বের করতে হয়। মিশরের পিরামিড তার জ্ঞানের দরজাকে খুলে দিয়েছিলো। বিশাল পিরামিড নির্মানের সময় যে গাণিতিক নিয়ম অনুসারে পাথর গুলিকে সাজানো হয়েছিলো তাতে পিথাগোরাসের অনুসন্ধানী চোখ আটকে গিয়েছিলো। পিরামিড দর্শনের পর থেকে তার মনে ভাবান্তর দেখা দেয়; তিনি জ্যামিতি বিদ্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। এর পরিণতিতে বিশ্ব পেয়েছিলো গনিত শাস্ত্রের এক আদি গুরুকে। মিশর থেকে ফিরে এসে তিনি অধ্যয়ন শুরু করেন ভারতীয় গণিতবিদ বৌধায়নের গণিত সম্পর্কিত গ্রন্থ। বৌধায়ন ছিলেন খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০ শতকের এক ভারতীয় পন্ডিত।
পিথাগোরাসের কাজ তাকে এখনও অমর করে রেখেছে। তিনি দেবতা ছিলেন না, কিন্তুু দেবতার মত পুজ্য ছিলেন তার জীবদ্দশায়। তার শিষ্য হওয়ার জন্য অনেক দূরদূরান্ত থেকে শিষ্যরা তার কাছে এসে ভিড় জমাতো। তার শিষ্য হওয়ার সৌভাগ্য সবার হতো না। তার শিষ্য হওয়ার সৌভাগ্য যাদের হতো তারা পিথাগোরীয়ান হিসেবে সবার কাছে পরিচিত হতো। পিথাগোরাস তার ছাত্রদেরকে দক্ষ করে তুলতেন জ্যামিতি বিদ্যায়, তার ছাত্ররা অগ্রসর হতো অংক শাস্ত্রে, তার শিষ্যরা অগ্রগামী থাকতো জ্যোতির্বিদ্যায়। তার তত্বাবধানে থেকে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানে-দর্শনে এমনকি সঙ্গীত বিদ্যায়ও দক্ষ হয়ে উঠতো। তার সময়ের একজন সর্বশ্রেষ্ট শিক্ষক হওয়া সত্বেও নিজের সম্পর্কে তিনি বলতেন–আমি হলাম জ্ঞান ভিক্ষুক। তার সম্বন্ধে হেরাক্লিটাস লিখেছেন-“
পিথাগোরাসের জ্ঞান সাধনা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের সীমাকে অতিক্রম করেছিল। বহু পদার্থ সম্বন্ধে যেমন তাঁর জ্ঞান ছিল তেমনি বহু হানিকর প্রয়োগবিদ্যাও তার জ্ঞাত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য এবং তিনি অপ্রাকৃত নিরাময় শক্তির অধিকারী ছিলেন”
পিথাগোরাস ছিলেন আত্মার অমরত্বে এবং মরণোত্তর জীবনে বিশ্বাসী এক মানুষ। তার পরবর্তী দার্শনিক এরিস্টটল ছিলেন তার দ্বারা প্রভাবিত। আর তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গণিতবিদ ইউক্লিড নিজের পথ নির্মান করে বিশ্বে হয়েছেন স্মরণীয় ও বরণীয়। ৫৮০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে পিথাগোরাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন তুরস্কের পশ্চিমে সামস দ্বীপে। আর তার মৃত্যু হয়েছিলো ৫০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। স্বাভাবিক মৃত্যু ছিলোনা তার। এক জনপ্রিয় মহান ব্যক্তিও দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন অত্যন্ত করুণ পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে। তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো, আর এভাবে গণিত শাস্ত্রের এই বিশাল সূর্য মাটিতে গোঙাতে গোঙাতে পরকালের উদ্দেশ্য লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেলেন।
ইস্কিলুস
ইস্কিলুস হলেন বিশ্ব সাহিত্যের প্রবাহিত ধারায় এক কালজয়ী সাধকের নাম। তার জীবন একদিকে নন্দিত এবং আরেকদিকে বিতর্কিতও। গ্রীক সাহিত্যে যে কয়জন নাট্যকারের নাম এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে ইস্কিলুস অন্যতম। জন্মগ্রহণ করেছেন খ্রীষ্টপূর্ব ৫২৫ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে। তিনি জীবনে মোট ৯০টির মত নাটক রচনা করে গেছেন। মাত্র ৭টা নাটক বর্তমান সময় পর্যন্ত টিকে আছে। বিয়োগান্ত নাটকের কথা বললেই তার নাম সবার আগে লিখতে হয়। তার সুযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে সফোক্লিস ও ইউরিপিডেস এর নাম উল্লেখযোগ্য। গ্রীসের ধ্রুপদী সাহিত্য এই তিন মহাসাধকের হাতের ছোঁয়ায় এগিয়ে গিয়েছে।
ইস্কিলুস ছিলেন এথেন্সের এক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। তার পিতার নাম ইউফোরিয়ান। তিনি এথেন্সের ছোট্ট শহর ইলিউসিসের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। যে কারণে ইস্কিলুসের শৈশবকাল অত্যন্ত আরাম আয়েসে কেটে যায়। ইস্কিলুস নিজ শহর ছেড়ে বাইরে খুব একটা বেরুন নি।
ইস্কিলুসের সবচে জনপ্রিয় নাটকের নাম ‘দ্য পার্সিয়ানস’ এবং বিতর্কিত নাটক হলো “প্রমিথিউস বাউন্ড”। বার বার তার জীবনে ধেয়ে এসেছিলো দূর্যোগ। তাকে হত্যার প্রচেষ্টাও করা হয়েছিলো। এমনকি তাকে কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছিলো। এসব অনাকাংখীত ঘটনার মোকাবেলা করে তিনি ৪৫৮ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে চলে গিয়েছিলেন সিসিলিতে। ওখানেই তার মৃত্যু হয়, তবে এ মৃত্যু নিয়ে অনেক মজার কাহিনী রয়েছে ইতিহাসের পাতায়।
ইস্কিলুস কখনোই ঘরের ভেতরে ঘুমাতেন না। এক জ্যোতিষির ভবিষ্যদ্বানী হলো তিনি মারা যাবেন উপর থেকে কিছু একটা মাথায় পড়ে। তার আশংকা ছিলো যদি ঘরের ছাদ মাথায় পড়ে তার মৃত্যু ঘটে যায়। এ কারণে একদিন তিনি ঘরের বাইরে খোলা ময়দানে শুয়েছিলেন। ল্যামার্জার নামক এক প্রজাতির শকুন আছে, এরা কচ্ছপ খেয়ে বেঁচে থাকে। তারা কচ্ছপ ধরে আকাশে উড়াল দেয় এবং কচ্ছপকে অনেক উপর থেকে পাথরে ছুঁড়ে মারে। একারণে একটা কচ্ছপের দেহের শক্ত খোলস ভেঙে যায়। এরকম একটা শকুন কচ্ছপ ধরে উপর থেকে ইস্কিলুসের মাথায় ফেলে দেয়। মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যায়, আর এভাবে এক কালজয়ী মানুষের ভবলীলা সাঙ্গ হয়। কার মৃত্যু কী অবস্থায় হবে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
সফোক্লিস
গ্রীক ট্রাজেডি নাটকের এক বরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সফোক্লিস। তার লেখা ইডিপাস নাটক এখনও বিশ্ব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে টিকে আছে। তার আরেক নাটক হলো এ্যান্টিগনি, এই নাটকও টিকে আছে সকল প্রতিবন্ধতাকে জয় করে। তিনি ছিলেন গ্রীক নাট্যকার ইস্কিলাসের ছাত্র। তার জন্ম ৪৯৫ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে এথেন্সের কলোনাস নামক এক গ্রামে। তার পিতা সফিলাস ছিলেন এথেন্সের একজন দক্ষ কর্মকার। সফোক্লিসের জন্মের সময়টা ছিলো গ্রীসের জন্য এক অগ্নি পরীক্ষার সময়। এ সময়ে পারস্য বাহিনীর আক্রমনে গ্রীস হয়ে গিয়েছিলো দিশেহারা। গ্রীসের জনগণ এ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো স্বদেশ রক্ষার দৃঢ় অঙ্গিকার নিয়ে। এই যুদ্ধ ইতিহাসে সালামিসের যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত। এই যুদ্ধের ঢেউ তরুণ সফোক্লিসের মনকে আন্দোলিত করেছিলো। তিনিও তারুণ্যের উদ্দীপনায় একসময় যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। একসময় গ্রীক বাহিনীর জয় সূচিত হলে সৈনিকরা জনজীবনে ফিরে আসে।
যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে সফোক্লিস সাহিত্য সাধনায় মনোনিবেশ করেন। গ্রীক ট্রাজেডীর তিন কিংবদন্তী ইস্কুলাস ও ইউরিপিডিস এর মধ্যে সফোক্লিস অন্যতম। ইডিপাস নাটক সফোক্লিসের অমর কীর্তি। এটা এমন এক কাজ যে কাজের জন্য সফোক্লিস হয়েছেন জনপ্রিয় এবং একই সাথে কালজয়ীও।
পরিত্যক্ত এক শিশু যার পিতা ছিলেন এক রাজ্যের রাজা। কোন এক কারণে সে পিতা কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে ভিন্ন এক পরিবেশে বড় হয়েছিলো। দূর্ভাগ্যক্রমে একসময় সে তার পিতাকে হত্যা করেে, যদিও সে জানতো না নিহত ব্যক্তি তার জন্মদাতা পিতা এবং এক রাজ্যের রাজা। এই রাজার স্ত্রীর নাম জোকাস্টা। আর রাজার হত্যাকারীর নাম ছিলো ইডিপাস। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস যে ইডিপাস একসময় জোকাস্টাকে বিয়ে করে। সে জানতো না জোকাস্টা তার আপন জন্মদাত্রী মা। এই সত্য একসময় আর গোপন থাকেনা। প্রকাশিত হওয়ার পর জোকাস্টা আত্মহত্যা করেন এবং ইডিপাস নিজের চোখকে উপড়ে ফেলে। এ-ই হলো ইডিপাস নাটকের আসল কাহিনী। গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের মতে ইডিপাস নাটক হলো পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট ট্রাজেডী নাটক। এরিস্টটল এই নাটকটি ট্রাজেডীর এক অনন্য নমুনা হিসেবে নিজের কাছে রাখতেন।
এই নাটক আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় ইডিপাসের মত এক নির্দোষ মানুষও নিয়তির খেলার পুতল হয়ে অভিশপ্ত জীবনের অধিকারী হয়ে গিয়েছিলো। এক ইস্পাত কঠিন মনোবলের মানুষও নিয়তির নিষ্টুর খেলায় আত্মসমর্পন করে জঙ্গলের পথ ধরে হারিয়ে গিয়েছিলো। এরিস্টটলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই নাটক সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
নব্বই বছরের জীবন অতিবাহিত করে সফোক্লিস পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও, তার অমর সৃষ্টি ইডিপাস এখনও বিদায় নেয়নি বিশ্ব সাহিত্যের রঙ্গমঞ্চ থেকে। আগামী হাজার হাজার বৎসর ধরেও হয়তো ইডিপাস নাটকটি নিজের অস্তিত্বকে জানান দিয়ে যাবে।
ইউরিপিদেস
“প্রেম ও প্রতিশোধ, দুটোই মানুষকে ধ্বংস করে।”–কথাটি বলেছিলেন গ্রীক নাট্যকার ইউরিপিদেস। খ্রীষ্টপূর্ব ৪৮০ অব্দে তিনি এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মনেসারকুস ও মাতার নাম ক্লিটো। গ্রীক ট্রাজেডী নাটকের অন্যতম এই প্রবাদ পুরুষ শেষ পর্যন্ত এথেন্স ছেড়েছিলেন তার যুক্তিবাদীতার কারণে। তার শেষ জীবন কেটেছিলো মেসিডোনায়, ওখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মোট ৯২ টি নাটকের নির্মাতা ছিলেন তিনি। তার আলোচিত নাটক ওরেস্তেস ও মেডিয়া।
হিরোডোটাস
ভূগোলবিদ হওয়ার ইচ্ছা ছিলো তার, কিন্তুু শেষ পর্যন্ত তিনি হয়ে গেলেন কালজয়ী এক ইতিহাসবিদ। ইতিহাস তাকে সাব্যস্থ করেছে ইতিহাসের জনক হিসেবে। তার আগে কেউই ইতিহাসের ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করেনি। আর এই কাজ শুরু করেছিলেন হিরোডোটাস। গ্রীক-পার্সিয়ান যুদ্ধ নিয়ে লেখা শুরু করে আজীবন তিনি এই মাধ্যমে কাজ করে যান। হিরোডোটাসের জন্ম ৪৮৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে এশিয়া মাইনরের হেলিকারনাসাসের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। কিন্তুু জন্মভুমিতে বেশী দিন অবস্থান করা সম্ভব হয়নি। হেলিকারনাসসের মায়া ছেড়ে গিয়েছিলেন এথেন্সে। ওখানেও তার পেছেন লেগেছিলো ফেউ। দূর্ভাগ্য সবসময় তার পেছনে পেছেনে থাকতো। তার শেষ জীন কেটেছিলো ইটালীর থোরী নগরীতে, ওখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
পানিয়াসিসঃ
———————-
গ্রীক ভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ কবির নাম পানিয়াসিস। তিনি খ্রীষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দিতে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসবিদ হিরোডোটাস ও পানিয়াসিস দীর্ঘদিন সামোস দ্বীপে অবস্থান করেন। তার সম্পর্কে বেশী তথ্য জানা না থাকলেও তার পিতার নাম ছিল পলিয়ার্কেস। তিনি ৪৫৪খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
থুসিডাইডিস
হিরোডোটাস ও থুসিডাইডিস দু’জনই ইতিহাসবিদ। দু’জনের চলার পথ একদিকে হলেও তাদের চিন্তার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়। থুসিডাইডিসের মতে ইতিহাস হলো প্রামান্য তথ্য নির্ভর। তথ্য ও প্রমাণের অনুপস্থিতে একটা ইতিহাস রুপকথার গল্পে পরিণত হয়। History of the peloponnesian war গ্রন্থের জন্য এখনও থুসিডাইডিস বিশ্ববাসীর কাছে সমাদৃত ও আলোচিত। তার কলমে উঠে এসেছে পিলোপনেসীয় যুদ্ধের বর্ননা। অপরদিকে হিরোডোটাসের কলমে এসেছে গ্রীক-পারসিক যুদ্ধের বর্ননা।
এই মহান ইতিহাসবিদ ও লেখকের জন্ম এথেন্সের এক অভিজাত পরিবারে খ্রীষ্টপূর্ব ৪৬০ অব্দে। হিরোডোটাস হলেন ইতিহাসের জনক, আর থুসিডাইডিস হলেন বৈজ্ঞানিক ইতিহাস চর্চার জনক।
দেমোক্রিতোস
গ্রীক বিজ্ঞানী দেমোক্রিতোস খ্রীষ্টপূর্ব ৪৭০ অব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রকৃতি বিজ্ঞান নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেন। ফিওদর করোভকিন তার পৃথিবীর ইতিহাস প্রাচীন যুগ গ্রন্থে দেমোক্রিতোস সম্পর্কে লিখেছেন–” He was the one who expressed the idea that the entire universe is made up of tiny particles. With the development of science, the question of the non-existence of gods and goddesses came to people’s minds. Democritus showed that there is no such thing as a human soul.” ফিওদর করোভকিন আরও লিখেছেন–” দেব-দেবীর প্রতি বিশ্বাস ও মানুষের আত্মার অবিনশ্বরতার বিরুদ্ধে দেমোক্রিতোসের শিক্ষা বহু গ্রীক দাস মালিককে তার শত্রু করে তুলেছিল। তাদের একজন দেমোক্রিতোসের রচনাবলী নিশ্চিহ্ন করার আহবান জানায় এবং আবেদন করে যে, তার অনুসরণকারীদের একদলকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হোক, আরেকদলকে বেত্রাঘাত করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হোক, আর তৃতীয় দলকে নাগরিক অধিকারবঞ্চিত করা হোক”।
দেমোক্রিতোস ছিলেন গ্রীসের এক ধনী পরিবারের ছেলে। তার পিতা তাকে জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি বহুদেশ ভ্রমনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। পিতার পৃষ্টপোষকতায় দেমোক্রিতোস ইথিওপিয়া, এমনকি ভারতও ভ্রমন করেছিলেন। তিনি মিশর ভ্রমন করে সেদেশের গণিতবিদদের উল্লেখ করে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। দেমোক্রিতোস সম্পর্কে ডায়োজিনিস লাতিয়ার্স বলেন–” তিনি তার সমস্ত ধারণা পিথাগোরাস এর কাছ থেকে নিয়েছেন বলে মনে হয় এবং যদি কালানুক্রমিক না থাকতো তবে তাকে তার ছাত্র ভাবা যেতে পারে”।
ডায়োজিনিস
পারস্য থেকে লুট করা এক দামী বাক্স সম্পর্কে আলেকজান্ডারকে জিজ্ঞ্যেস করা হয়েছিলো এ বাক্সে কী রাখবেন? উত্তরে আলেকজান্ডার বলেছিলেন এ বাক্সে “ইলিয়াড” রাখবো। এতে পরিস্কার যে তার কাছে ইলিয়াড ছিলো এক মহামুল্যবান গ্রন্থ। আরেকবার তিনি বলেছিলেন আমি যদি আলেকজান্ডার না হতাম, তবে ডায়োজিনিস হতে চাইতাম। তার একথা প্রমান করে যে ডায়োজিনিস ছিলেন গ্রীসের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আলেকজান্ডারের এ মুল্যায়ন আজ প্রমানীত সত্য।
কে এই ডায়োজিনিস? এক অদ্ভূদ মানুষ ছিলেন এই ডায়োজিনিস। একটা পাইপের ভেতরে ছিলো তার ঘর। এই পাইপের ভেতরেই তার জীবন কেটেছে। তার কাছে আসতেন আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট। কিন্তুু ডায়োজিনিস অহেতুক সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে বিরক্তি প্রকাশ করতেন। জ্ঞানের এই একনিষ্ট সাধক জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৪১২ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে। তাকে নিয়ে অনেক মজার মজার গল্প প্রচলিত আছে ইতিহাসে। ডায়োজিনিস এমন এক ব্যাক্তিত্ব ছিলেন পৃথিবীতে তার কোন কিছুর প্রয়োজন ছিলো না। পাইপের ভেতরে ছিলো একটা লাঠি ও পানি খাওয়ার একটা পাত্র। একদিন তিনি দেখলেন একটা শিশু হাত দিয়ে পানি খাচ্ছে।
এটা দেখার পর ডায়োজিনিস বললেন একটা শিশুর কাছে আমি হেরে গেলাম। তারপর পানির পাত্রটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেন–পানি খাওয়ার জন্য কোন পাত্র রাখার কোন প্রয়োজন নেই। এ-ই হলেন ডায়োজিনিস। একদিন আলেকজান্ডার তাকে জিজ্ঞ্যেস করলেন আপনি কি আমাকে ভয় করেন না? উত্তরে ডায়োজিনিস বললেন আগে বলো তুমি ভাল মানুষ না খারাপ মানুষ। আলেকজান্ডার বললেন অবশ্যই ভাল মানুষ। সম্রাটের কথা শুনে ডায়োজিনিস বললেন তাহলে ভয় পাওয়ার তো কোন কারণ নেই। আলেকজান্ডারের খুব ইচ্ছা ছিলো এই মহান দার্শনিকের জন্য কিছু করার। কিন্তুু ডায়োজিনিস আলেকজান্ডারের এই আশা পুরণ হতে দেননি। একদিন আলেকজান্ডার বললেন, বলেন না কেনো আমি আপনার জন্য কী করতে পারি? ডায়োজিনিস বললেন–তুমি একটু সরে দাঁড়ালে আমি শীতের সকালের রোদ পোহাতে পারি।
একদিন ডায়োজিনিস দিনের বেলায় লণ্ঠন জ্বালিয়ে রাস্তায় বের হয়েছেন। সবাই তাকে জিজ্ঞ্যেস করলো, এ অবস্থা কেনো? ডায়োজিনিস উত্তরে বললেন আমি সৎ মানুষের খোঁজে বের হয়েছি। তিনি আপাদমস্তক সক্রেটিশপন্থী ছিলেন, সক্রেটিশের নৈতিক দর্শন প্রতিষ্টার জন্য তিনি অদ্ভুত জীবন বেছে নিয়েছিলেন।
এপিকিউরাস
এপিকিউরাস নিয়ে বিতর্কের শেষ এখনও হয়নি। কেউ বলছেন তিনি নাস্তিক ছিলেন। কেউ কেউ বলেন–না, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। খ্রীষ্টবাদ তখনও পৃথিবীতে আসেনি, আসবেই বা কিভাবে? যীশু খ্রীষ্টের জন্মও হয়নি তখন, যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন এপিকিউরাস। যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ৩৪১ বছর পূর্বে গ্রীসের এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান দার্শনিক। তিনি সারাবিশ্বে আলোচিত এবং সমালোচিত হাজার হাজার বৎসর ধরে। তার রেখে যাওয়া তত্ব “মন্দ-সমস্যা যুক্তির” গোড়ায় পানি ঢেলে এই তত্বকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম(১৭১১খ্রীঃ–১৭৭৬খ্রীঃ)।
এপিকিউরাসের প্রশ্ন ছিলো–আল্লাহ তো সর্বশক্তিমান, তাঁর ক্ষমতার বাইরে কিছু নাই, তিনি যা ইচ্ছা করেন তা-ই হয়। কিন্তুু তাঁর চোখের সামনে পৃথিবীতে কত অন্যায় ও অবিচারের ঘটনা ঘটছে তার প্রতিরোধ তিনি করেন না কেনো? যদি বলা হয় প্রতিরোধ করার ইচ্ছা তার আছে। কিন্তুু প্রতিরোধ করতে তিনি অক্ষম। এক্ষেত্রে তিনি পুরুষত্বহীন। যদি বলা হয় প্রতিরোধ করার মত তার ক্ষমতা আছে। কিন্তুু প্রতিরোধ করার ইচ্ছার ঘাটতি রয়েছে, তাহলে তিনি নিষ্টুর। যদি বলা হয় তার ইচ্ছার কোন ঘাটতি নেই এবং প্রতিরোধ করার মত ক্ষমতাও তার আছে। তাহলে পৃথিবীতে অন্যায়-অবিচার-অনিয়ম থাকার কথা নয়। পৃথিবীটা অন্যায়-অবিচারে ভরপুর মানে এখানে কোন সর্বশক্তিমানের উপস্থিতি নাই। এপিকিউরাসের এরকম প্রশ্ন একটা মতবাদ হয়ে অনেক নাস্তিকের জন্ম দিয়েছিলো। তার সময়কাল পেরিয়ে কমপক্ষে আড়াই হাজার বৎসর পরে এই বাংলাদেশের কয়েকজন বুদ্ধজীবির মাথাকে এলোমেলো করে দিয়েছিলো। এই বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে ডঃ আহমদ শরীফ, বদর উদ্দীন উমর, ডঃ হুমায়ুন আজাদ, আরজ আলী মাতুব্বরের নাম উল্লেখযোগ্য। এই বুদ্ধিজীবিরা স্বীকার করেছেন তাদের নাস্তিক হওয়ার নেপথ্য কারণ হলো এপিকিউরাসের এই তত্ব। মজার ব্যাপার হলো এপিকিউরাসের এই তত্ব নাস্তিক তৈরীর কারখানা হলেও এই কারখানার মালিক এপিকিউরাস কিন্তুু নাস্তিক ছিলেন না। তিনি এই বিশ্বজগত পরিচালনায় এক মহাধর সর্বশক্তিমানের উপস্থিতিকে কখনও অস্বীকার করেন নি।
এপিকিউরাস সারাজীবন সুখের সন্ধানে ছিলেন। তার দর্শনে তাকে এক ভোগবাদীর চেহারা দেখা গেলেও বাস্তবজীবনে তিনি ভোগবাদী ছিলেন না। তার জীবনী পাঠে জানা যায় তিনি বিয়ে না করে একাকীত্ব জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। সুখের সন্ধানে থাকলেও জীবনে সুখের পাখিকে হাতের মুঠোয় আনতে পেরেছিলেন কিনা এ রকম প্রশ্ন অনেক জীবনীকার এড়িয়ে গেছেন। তার জীবনী পাঠে এ কথা জানা যায় যে প্রথম জীবনে তিনি দার্শনিকদের প্রতি বিরুপ মনোভাব পোষণ করতেন, এমনকি কখনও তিনি সক্রেটিশ-প্লেটো-এরিস্টটলের দর্শন দ্বারাও প্রভাবিত হন নি। তবে দার্শনিক-বিজ্ঞানী দেমোক্রিতোস এর ছায়া পড়েছিলো তার উপরে। হয়তো নিয়তি ছিলো এটাই, আর এভাবে তিনি একসময় নিজেই হয়ে উঠলেন হাজার বছরের এক মহান দার্শনিক।
মাত্র বাহাত্তর বছরের জীবন পেয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে তার স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি বন্ধু ও শুভাকাংখীদের জন্য দান করে গিয়েছেন। তার দর্শনকে যারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তারা এপিকিউরিয়ান হিসেবে জগদ্বাসীর কাছে পরিচিত এবং তার রেখে যাওয়া দর্শন এপিকিউরানিজম হিসেবে দর্শন শাস্ত্রের এক বিষয় হিসেবে এখনও টিকে রয়েছে। এই মহান দার্শনিক ২৭০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ইহলোক ত্যাগ করেন।
(চলবে)
লেখক: ছড়াকার ও প্রাবন্ধিক